নজমুল হক, স্টাফ রিপোর্টার গাজীপুর
ঢাকা শহরের উন্নয়নের প্রতীক হিসেবে একের পর এক ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—এই অবকাঠামোগত উন্নয়ন যানজট নিরসনে প্রত্যাশিত সুফল দিতে পারেনি। বরং নাগরিকদের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা বলছে, যানজট যেন আরও জটিল, দীর্ঘস্থায়ী এবং কষ্টকর হয়ে উঠছে। প্রশ্ন জাগে—সমস্যা কি অবকাঠামোর ঘাটতিতে, নাকি পরিকল্পনার সীমাবদ্ধতায়? পরিসংখ্যান বলছে, ঢাকায় যানজট এখন কেবল বিরক্তির কারণ নয়, এটি জাতীয় অর্থনীতির ওপরও বিশাল চাপ সৃষ্টি করছে। বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, রাজধানীতে প্রতিদিন প্রায় ৩.২ মিলিয়ন কর্মঘণ্টা নষ্ট হয় যানজটে বসে থেকে । অন্যদিকে কিছু গবেষণায় এই ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি—প্রায় ৫ মিলিয়ন কর্মঘণ্টা পর্যন্ত পৌঁছায় । অর্থনৈতিক ক্ষতির দিক থেকে বছরে প্রায় ৩৭০ বিলিয়ন টাকার ক্ষতি হচ্ছে বলে ধারণা করা হয় । একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য এই ক্ষতি নিঃসন্দেহে গভীর উদ্বেগের।যানবাহনের গড় গতি পরিস্থিতির করুণ চিত্র তুলে ধরে। একসময় ঢাকায় গাড়ির গড় গতি ছিল ঘণ্টায় ২১ কিলোমিটার, যা কমে এখন প্রায় ৫ থেকে ৭ কিলোমিটারে নেমে এসেছে—যা প্রায় হাঁটার গতির সমান । এর অর্থ হলো, যতই ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হোক না কেন, সামগ্রিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা উন্নত না হলে গতি বাড়ানো সম্ভব নয়। এখানেই মূল সমস্যার সূত্র খুঁজে পাওয়া যায়। ঢাকার যানজট কেবল রাস্তার ঘাটতির কারণে নয়; এটি একটি বহুমাত্রিক সমস্যা। প্রথমত, নগর পরিকল্পনার দীর্ঘদিনের দুর্বলতা। পরিকল্পনাহীন নগরায়ন, আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকার মিশ্রণ, এবং জনসংখ্যার অতিরিক্ত ঘনত্ব শহরের সড়ক ব্যবস্থাকে চাপে ফেলেছে। দ্বিতীয়ত, ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেলেও সড়কের পরিমাণ সে অনুপাতে বাড়েনি। ফলে ফ্লাইওভারগুলো মূলত এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যানজট স্থানান্তর করছে, সমাধান করছে না। তৃতীয়ত, গণপরিবহনের দুর্বলতা একটি বড় কারণ।
ঢাকায় প্রায় ৪৩ শতাংশ মানুষ বাসে যাতায়াত করে, কিন্তু এই বাসব্যবস্থা অদক্ষ, অপরিকল্পিত এবং প্রায়ই বিশৃঙ্খল । নির্ভরযোগ্য, দ্রুত ও আরামদায়ক গণপরিবহন না থাকলে মানুষ ব্যক্তিগত গাড়ির দিকে ঝুঁকবে—যা যানজট আরও বাড়ায়। চতুর্থত, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা, যেমন সিগন্যালিংয়ের অকার্যকারিতা, আইন প্রয়োগের দুর্বলতা এবং অপ্রশিক্ষিত চালকদের আচরণও সমস্যাকে জটিল করে তুলছে। এখন প্রশ্ন—সমাধান কী? প্রথমত, ফ্লাইওভার-কেন্দ্রিক উন্নয়ন থেকে সরে এসে সমন্বিত নগর পরিবহন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। মেট্রোরেল, বাস র্যাপিড ট্রানজিট (BRT) এবং রেলভিত্তিক যোগাযোগব্যবস্থাকে সম্প্রসারণ ও কার্যকর করতে হবে। দ্বিতীয়ত, গণপরিবহন ব্যবস্থাকে আধুনিক, নির্ভরযোগ্য এবং যাত্রীবান্ধব করতে হবে, যাতে মানুষ ব্যক্তিগত গাড়ির পরিবর্তে গণপরিবহন ব্যবহার করতে আগ্রহী হয়। তৃতীয়ত, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে—ইন্টেলিজেন্ট ট্রাফিক সিগন্যাল, রিয়েল-টাইম মনিটরিং এবং ডাটা-নির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণ চালু করা জরুরি। চতুর্থত, বিকেন্দ্রীকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সব ধরনের অফিস, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম ঢাকাকেন্দ্রিক না রেখে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে ছড়িয়ে দিতে হবে। সবশেষে বলা যায়, শুধু ফ্লাইওভার নির্মাণ দিয়ে ঢাকার যানজট সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন সুপরিকল্পিত, সমন্বিত এবং দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ। অন্যথায়, উন্নয়নের প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকা এসব ফ্লাইওভারই একদিন ব্যর্থতার স্মারক হয়ে থাকবে।

Leave a Reply