হলুদ ট্যাগের বীজে আগাম শীষ, ক্ষতির মুখে পটুয়াখালীর কৃষক

হলুদ ট্যাগের বীজে আগাম শীষ, ক্ষতির মুখে পটুয়াখালীর কৃষক

হলুদ ট্যাগের বীজে আগাম শীষ, ক্ষতির মুখে পটুয়াখালীর কৃষক

পটুয়াখালী প্রতিনিধি, 

ভালো ফলনের আশায় বীজ কিনেছিলেন কৃষকরা। বস্তায় ছিল সরকারি প্রত্যয়নসংক্রান্ত হলুদ ট্যাগ, কোম্পানির ব্র্যান্ড ও উচ্চফলনশীল ধানের পরিচয়। নির্ধারিত নিয়ম মেনে বীজ তৈরি করে আমন মৌসুমে জমিতে রোপণও করেছিলেন তারা। কিন্তু ধান কাটার স্বাভাবিক সময় আসার অনেক আগেই জমির একেকটি গোছায় প্রায় অর্ধেক চারায় বেরিয়ে এসেছে ধানের শীষ। কাঁচা ধান আগাম বের হওয়ায় এখন স্বাভাবিক সময়ে এগুলো টিকবে কি না, তা নিয়েই দুশ্চিন্তায় পটুয়াখালীর কলাপাড়ার কৃষকরা।

কৃষকদের অভিযোগ, ইউনাইটেড সীড ব্র্যান্ডের ব্রি-৪৯ ধানের বীজ কিনে এমন পরিস্থিতিতে পড়েছেন তারা। কলাপাড়া উপজেলার আলিপুর ও মহিপুর এলাকায় অর্ধশতাধিক কৃষকের জমিতে একই ধরনের আগাম শীষ বের হওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। কৃষকদের আশঙ্কা, একই গোছায় ধানের পরিপক্বতার সময় এক না হওয়ায় আগাম বের হওয়া ধান স্বাভাবিক কাটার সময়ের আগেই নষ্ট হয়ে যেতে পারে। ফলে শতাংশপ্রতি কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ পাকা ধান পাওয়া যাবে না। আর এতে জমি প্রস্তুত থেকে শুরু করে সার, কীটনাশক, শ্রমিক ও অন্যান্য খরচে করা পুরো বিনিয়োগই লোকসানে পড়তে পারে।

মাঠপর্যায়ে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আলিপুর ও মহিপুর বাজারের বিভিন্ন বীজ ডিলার ও বিক্রেতার কাছ থেকে তারা ইউনাইটেড সীডের প্যাকেটজাত বীজ কিনেছেন। বস্তার গায়ে লেখা খুচরা মূল্য পরিশোধ করেই বীজ সংগ্রহ করেন তারা। পরে ওই বীজ দিয়ে নিজেরাই বীজ তৈরি করে জমিতে রোপণ করেন।

কৃষকদের ভাষ্য, বীজ তৈরি ও চারা রোপণের সময় কোনো অস্বাভাবিকতা চোখে পড়েনি। কিন্তু রোপণের প্রায় ১৫ দিনের মধ্যেই ধানের চারায় আগাম শীষ বের হতে শুরু করে। প্রথমে বিচ্ছিন্ন ঘটনা মনে হলেও পরবর্তী সময়ে একই এলাকার একাধিক কৃষকের জমিতে একই ধরনের চিত্র দেখা যায়। এরপর কৃষকেরা বীজ বিক্রেতা, ডিলার ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

অভিযোগের পর স্থানীয় ডিলার ও বিক্রেতাদের পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে বলে কৃষকেরা জানান। কিন্তু ক্ষতির পরিমাণ কীভাবে নির্ধারণ হবে, কে ক্ষতিপূরণ দেবে এবং কখন দেবে এসব বিষয়ে এখনো কোনো লিখিত নিশ্চয়তা নেই। ফলে কৃষকদের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ।

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের হাতে থাকা বস্তাগুলোতে ইউনাইটেড সীড ব্র্যান্ডের ব্রি-৪৯ জাতের ধানের তথ্য রয়েছে। ১০ কেজির বস্তায় অঙ্কুরোদ্গমের হার ৮০ শতাংশ, বিশুদ্ধতার হার ৯৮ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ১ হাজার ২০০ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে। মেয়াদের শেষ তারিখ চলতি বোরো/আমন মৌসুম পর্যন্ত লেখা থাকলেও উৎপাদনের তারিখ উল্লেখ নেই বলে কৃষকদের অভিযোগ।

কৃষকেরা বলেন, বস্তার গায়ে উচ্চফলনশীল উল্লেখ এবং হলুদ ট্যাগ দেখে তারা বীজের প্রতি আস্থা রেখেছিলেন। তাদের ধারণা ছিল, প্রত্যয়ন করা বীজ কিনে চাষ করলে অন্তত বীজের উৎস ও বাজারজাত ব্যবস্থায় সরকারি নজরদারি রয়েছে। কিন্তু এখন জমিতে আগাম শীষ বের হওয়ায় তাদের সেই আস্থাই প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

এখানে প্রশ্ন উঠছে বীজের জাত বা ল্যাব-মান নিয়ে নয়; বরং যে বীজ সরকারি প্রত্যয়নসংক্রান্ত হলুদ ট্যাগ নিয়ে বাজারে এসেছে, সেটি কীভাবে একাধিক ডিলার ও বিক্রেতার মাধ্যমে কৃষকের জমিতে পৌঁছাল এবং বাজারজাতকরণের পুরো প্রক্রিয়ায় তদারকি কতটা ছিল তা নিয়ে।

পটুয়াখালী জেলা বীজ প্রত্যয়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় নিবন্ধিত বীজ ডিলারের সংখ্যা ১২৪টি। এর মধ্যে কলাপাড়া উপজেলায় ১২ জন এবং আলিপুর-মহিপুর এলাকায় তিনজন ডিলার রয়েছেন।

আলিপুর বাজারের হাওলাদার কৃষি ঘরের স্বত্বাধিকারী মো. সোহেল নিজেকে ইউনাইটেড সীডের নিবন্ধিত পরিবেশক হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। তার দাবি, তার কোডের মাধ্যমে স্থানীয় অন্তত ২০ জন বিক্রেতা বীজ নিয়েছেন। আবু ডিলার, চানমিয়া বেপারী ও আলী বীজ ঘরসহ বেশ কয়েকজন বিক্রেতা তার কাছ থেকে বীজ নিয়েছেন।

সোহেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিনি সরাসরি কোম্পানির কাছ থেকে প্যাকেটজাত বীজ এনে বিভিন্ন ডিলার ও কৃষকের কাছে বিক্রি করেন। চলতি মৌসুমে তিনি প্রায় ১ হাজার ২০০ বস্তা ইউনাইটেড সীড বিক্রি করেছেন।

এই তথ্যই এখন অনুসন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ সূত্র। একজন পরিবেশকের কোড ব্যবহার করে যদি অন্তত ২০ জন বিক্রেতা বীজ সংগ্রহ করে থাকেন এবং প্রায় ১ হাজার ২০০ বস্তা বাজারজাত হয়ে থাকে, তাহলে ওই বীজ কোন কোন বাজারে গেছে, কত কৃষক তা ব্যবহার করেছেন এবং অভিযোগ ওঠার পর একই চালানের অবিক্রীত বীজ কোথায় রয়েছে ?এসব তথ্য বের করা জরুরি।

বীজের প্রতিটি চালানের ক্রয়-বিক্রয় হিসাব, ডিলারভিত্তিক সরবরাহ, বস্তার ব্যাচ বা চালান নম্বর এবং বিক্রেতাদের বিক্রির রেকর্ড যাচাই করা হলে কৃষকের জমিতে পৌঁছানো বীজের পথটি স্পষ্ট হতে পারে।

কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আলিপুর ও মহিপুর এলাকার আলী বীজ ঘর, আকন বীজ ঘর, হাওলাদার কৃষি ঘরসহ প্রায় ১০টি প্রতিষ্ঠানে একই ব্র্যান্ডের বীজ পাওয়া গেছে। কৃষকদের দাবি, এসব বস্তার লেখা, ডিজাইন ও রং একই ধরনের।

অর্থাৎ নির্দিষ্ট একটি কোম্পানির প্যাকেটজাত বীজ স্থানীয় বাজারে একাধিক বিক্রেতার মাধ্যমে কৃষকের হাতে গেছে। ফলে অভিযোগের পর দায় নির্ধারণের প্রশ্নটি শুধু একজন বিক্রেতা বা কৃষকের সঙ্গে লেনদেনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; কোম্পানি, পরিবেশক, ডিলার ও খুচরা বিক্রেতা পুরো সরবরাহব্যবস্থাই যাচাইয়ের প্রয়োজন রয়েছে।

লতাচাপলি ইউনিয়নের খাজুরা এলাকার কৃষক কালু মুসল্লী প্রায় দুই একর জমিতে ইউনাইটেড সীডের ব্রি-৪৯ ধান চাষ করেছেন। তিনি স্থানীয় বাজারের হাজী মোহাম্মদ চান মিয়ার কাছ থেকে বীজ কিনেছিলেন। পরে সেই বীজ দিয়ে নিজেই বীজ তৈরি করে জমিতে রোপণ করেন।

কালু মুসল্লী  বলেন, তার জমিতে আগেভাগেই প্রায় চার আনা পরিমাণ ধানে শীষ বের হয়ে গেছে। ভালো ফলনের আশায় সরকারি ধানের পরিবর্তে কোম্পানির বীজ কিনেছিলেন। কিন্তু এখন ফলনের আগেই ক্ষতির আশঙ্কা করছেন তিনি।

কৃষক মো. মেহেদী খান এক কানি ছয় কড়া জমিতে একই বীজ ব্যবহার করেছেন। তার ভাষ্য, জমির অনেক ধানের গোছায় নির্ধারিত সময়ের আগেই কাঁচা ধান বের হয়ে গেছে। সার ও ওষুধের দাম এবং চাষাবাদের খরচ বহন করার পর এমন পরিস্থিতিতে পড়ায় পুরো বিনিয়োগ লোকস

Leave a Reply

Your email address will not be published.