
আশিকুর রহমান সবুজ, শ্রীপুর (গাজীপুর)
গাজীপুরের শ্রীপুরে আদালতের রায় ও স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে একটি অসহায় পরিবারের ওপর বর্বর হামলা, মারধর ও বসতবাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে এক সাবেক আওয়ামী লীগ কাউন্সিলর ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে। আজ ৩০ মে ২০২৬ (শনিবার) সকাল আনুমানিক ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে শ্রীপুর পৌরসভার বেড়াইদেরচালা গ্রামে এই ঘটনা ঘটে। হামলায় নারী ও বৃদ্ধসহ একই পরিবারের অন্তত ৫ জন গুরুতর রক্তাক্ত জখম হয়েছেন। এদের মধ্যে আশঙ্কাজনক অবস্থায় একজনকে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
ভুক্তভোগী পরিবার ও থানায় দায়ের করা লিখিত অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, বেড়াইদেরচালা গ্রামের মোছাঃ মাকসুদা খাতুন (৪০) ও তার পরিবারের সাথে প্রতিপক্ষ মোঃ হাবিবুল্লাহ (৫৫), মোঃ সুলতান উদ্দিন (৬০) গংদের দীর্ঘদিন যাবৎ পৈত্রিক জমি নিয়ে বিরোধ আসছিল। এই বিষয়ে ভুক্তভোগী পরিবারটি আদালতের শরণাপন্ন হলে পবিত্র ঈদুল ফিতরের আগেই বিজ্ঞ আদালত সমস্ত নথিপত্র পর্যালোচনা করে ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষে চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন। একই সাথে আদালত বিরোধপূর্ণ জমির সীমানায় প্রতিপক্ষের প্রবেশ ও যেকোনো ধরনের হস্তক্ষেপে স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা জারি করেন।
স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আদালতের রায়কে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে আজ সকালে বিবাদীগণ রামদা, লোহার রড ও লাঠিসোটা নিয়ে বেআইনি জনতাবদ্ধে মাকসুদা খাতুনের শ্বশুরের মালিকানাধীন জমিতে অনধিকার প্রবেশ করে। এসময় ভুক্তভোগী পরিবারটি বাধা দিলে তাদের ওপর অতর্কিত ও নির্মম হামলা চালানো হয়। ১ নং বিবাদী মোঃ হাবিবুল্লাহ হত্যার উদ্দেশ্যে লোহার রড দিয়ে মাকসুদা খাতুনের মাথায় আঘাত করতে গেলে তিনি হাত দিয়ে তা ঠেকান। এতে তাঁর বাম হাত ভেঙে রক্তাক্ত জখম হয়। অন্য বিবাদীরা তাঁর গলা টিপে শ্বাসরোধ করার চেষ্টা করে এবং ১ ভরি ওজনের সোনার চেইন ছিনিয়ে নেয়।
হামলাকারীরা এখানেই ক্ষান্ত হয়নি। মাকসুদা খাতুনের যুবতী মেয়ে মোছাঃ বিথি (২১)-কে লক্ষ্য করে রামদা দিয়ে কোপ দিলে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এবং কোপটি তাঁর ডান উরুতে লেগে গভীর কাটার সৃষ্টি করে। পরবর্তীতে তাঁর হিজাব ও চুল ধরে টেনে-হেঁচড়ে শ্লীলতাহানি করা হয়। ঘটনাস্থলে আসা ৭০ বছর বয়সী বৃদ্ধা মোছাঃ সমলা খাতুন এবং মোছাঃ রেহেনা আক্তার (৪২)-কেও লাঠি ও রড দিয়ে পিটিয়ে গুরুতর জখম করে বিবাদীরা।
পরিবারের সদস্যদের আত্মচিৎকার শুনে মাকসুদা খাতুনের দেবর মোঃ সাইফুল ইসলাম (৫০) বাঁচাতে এগিয়ে আসলে ৪ নং বিবাদী মোঃ ফাহাদ (৩০) রামদা দিয়ে সরাসরি তাঁর মাথায় কোপ দেয়। এতে সাইফুল ইসলামের মাথার তালু ফেটে মারাত্মক রক্তাক্ত জখম হয় এবং তিনি অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে যান। স্থানীয় লোকজন এগিয়ে এসে আহতদের উদ্ধার করে দ্রুত শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। সেখানে সাইফুল ইসলামের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর (রেফার) করেন।
হামলার পর বিবাদী ও তাদের সহযোগী ১০/১২ জন অজ্ঞাতনামা দুষ্কৃতকারী ভুক্তভোগীদের বসতবাড়ির পশ্চিম ভিটির ঘরে ঢুকে ড্রয়ার ভেঙে নগদ ৩০,৫০০/- টাকা লুট করে। এছাড়া রামদা ও লাঠি দিয়ে ঘরের জানালা, আসবাবপত্র ও অন্যান্য জিনিসপত্র ভাঙচুর করে প্রায় ১৭,০০০/- টাকার আর্থিক ক্ষতিসাধন করে। এলাকা ছাড়ার সময় আসামিরা প্রকাশ্যে হুমকি দেয় যে, এই জমিতে পুনরায় এলে পুরো পরিবারকে খুন করে লাশ গুম করে ফেলা হবে এবং মিথ্যা মামলা দিয়ে জেল খাটানো হবে।
এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, ভিডিও ফুটেজে নারীদের নির্মমভাবে পেটাতে দেখা যাওয়া মূল ব্যক্তিটি এলাকার সাবেক আওয়ামী লীগ কাউন্সিলর এবং জানালা ভাঙচুরকারী তরুণটি তাঁর ছেলে। তাদের বিরুদ্ধে এলাকায় একাধিক চাঁদাবাজি ও মারামারির মামলা রয়েছে এবং তারা দীর্ঘদিন পলাতক ছিল। আজ হঠাৎ প্রকাশ্য দিবালোকে এলাকায় এসে তারা এই তাণ্ডব চালায়।
এই ঘটনায় ভুক্তভোগী মোছাঃ মাকসুদা খাতুন বাদী হয়ে শ্রীপুর মডেল থানায় ১০ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ১০/১২ জনকে আসামি করে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। ঘটনার পর থেকে এলাকায় চরম উত্তেজনা ও ভীতি বিরাজ করছে। ভুক্তভোগী পরিবারটি প্রশাসনের কাছে দ্রুত আসামিদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে।

Leave a Reply