
প্রতিবেদক মোঃ রাকিব হোসেন
গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার গাজীপুর উচ্চবিদ্যালয়ের সাবেক ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম বিএসসিকে ঘিরে চলমান বিরোধ ও অভিযোগের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একের পর এক ফেসবুক স্ট্যাটাস দিচ্ছেন তাঁর সাবেক শিক্ষার্থীরা। এসব স্ট্যাটাসে শিক্ষক হিসেবে নূরুল ইসলাম বিএসসির সঙ্গে তাঁদের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং তাঁর প্রতি শ্রদ্ধার কথা তুলে ধরার পাশাপাশি সুষ্ঠু তদন্তের দাবিও জানানো হয়েছে।শিক্ষার্থীদের বক্তব্যে একটি বিষয় বারবার উঠে এসেছে—অভিযোগ থাকলে তদন্ত হোক, সত্যতা যাচাই হোক; কিন্তু তদন্তের আগেই কোনো শিক্ষককে দোষী সাব্যস্ত, অপমান বা হেনস্তা করা উচিত নয়।
এসএসসি ২০০২ ব্যাচের এক সাবেক শিক্ষার্থী তাঁর ফেসবুক স্ট্যাটাসে গাজীপুর উচ্চবিদ্যালয়কে শৈশব, স্মৃতি ও স্বপ্নের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ করেন। দীর্ঘদিনের শিক্ষক হিসেবে নূরুল ইসলাম বিএসসির সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, গুরুতর কোনো অভিযোগ থাকলে তার ভিত্তি হওয়া উচিত প্রমাণ ও তদন্ত।ওই শিক্ষার্থী আরও বলেন, একজন শিক্ষক সম্পর্কে গুরুতর অভিযোগ ছড়ানোর আগে যথাযথ প্রমাণ থাকা প্রয়োজন। অভিযোগ থাকলে তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে সত্য বের করে আনার আহ্বান জানান তিনি।
এসএসসি ব্যাচ-২০২৫-এর সাবেক শিক্ষার্থী আলভী মাহমুদের দেওয়া স্ট্যাটাসেও নূরুল ইসলাম বিএসসির প্রতি শ্রদ্ধা ও সমর্থনের কথা উঠে এসেছে। সেখানে শিক্ষক হিসেবে তাঁর সততা, আদর্শ ও সাহসের প্রশংসা করে বলা হয়েছে, সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে তাঁরা অবস্থান করছেন।
এবার একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন এসএসসি ব্যাচ-২০২২-এর সাবেক শিক্ষার্থী আবির আহমেদ।
নিজের স্ট্যাটাসে তিনি নূরুল ইসলাম বিএসসিকে উদ্দেশ করে লিখেছেন, যাঁরা তাঁকে নিয়ে কথা বলছেন, তাঁদের উচিত একজন শিক্ষকের দায়িত্ব ও সীমাবদ্ধতা বোঝার চেষ্টা করা। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, কোনো অভিযোগ সত্য হলেও সেখানে শুধু একজন ব্যক্তির দায় নির্ধারণ করা হবে কেন? প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য শিক্ষক, পরিচালনা কমিটির সদস্য ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায়িত্ব ও জবাবদিহিতার বিষয়টিও তদন্তে আসা উচিত বলে মত দেন তিনি।
আবির আহমেদ আরও বলেন, অভিযোগ মানেই অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়। অভিযোগের ক্ষেত্রে তদন্ত, সত্যতা যাচাই এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আইন ও প্রতিষ্ঠানের নিয়ম অনুসারে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তবে অভিযোগের ভিত্তিতে একজন শিক্ষককে লাঞ্ছিত বা হেনস্তা করার অধিকার কারও নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।তাঁর বক্তব্যে নূরুল ইসলাম বিএসসির বিরুদ্ধে পরিচালিত কার্যক্রমের সমালোচনা করে একজন সাবেক শিক্ষার্থী হিসেবে শিক্ষকের মর্যাদা রক্ষার কথাও তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে তিনি আশা প্রকাশ করেন, নূরুল ইসলাম বিএসসি যথাসময়ে তাঁর বক্তব্য ও অবস্থান তুলে ধরে প্রকৃত সত্য সবার সামনে পরিষ্কার করবেন।অন্যদিকে সাবেক শিক্ষার্থী মোঃ সুমন বাপ্পী তাঁর ফেসবুক স্ট্যাটাসে গাজীপুর উচ্চবিদ্যালয়কে সবার আবেগ ও ঐতিহ্যের জায়গা হিসেবে উল্লেখ করে বিষয়টি নিয়ে সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেনতিনি বলেন, গাজীপুর উচ্চবিদ্যালয় কারও একার সম্পদ নয়। এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গাজীপুরের অসংখ্য মানুষের আবেগ জড়িয়ে রয়েছে। কোনো শিক্ষক দোষ করে থাকলে বা ভুল হয়ে থাকলে তার সঠিক সমাধান হওয়া উচিত। একে অপরকে দোষারোপ না করে বিদ্যালয়ের সুনাম ও ভবিষ্যৎ শিক্ষার্থীদের কথা বিবেচনা করার আহ্বান জানান তিনি।সুমন বাপ্পীর বক্তব্যে নূরুল ইসলাম বিএসসি ও সহকারী শিক্ষক মোতাহারসহ সংশ্লিষ্ট কাউকেই আগেভাগে দোষী না করার আহ্বান জানানো হয়। তাঁর মতে, অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা উচিত এবং ভুল হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্টদের সমাধানের পথে আসা উচিত।
নূরুল ইসলাম বিএসসিকে ঘিরে চলমান ঘটনাপ্রবাহে আরেকটি বিষয় নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তাঁর বিরুদ্ধে আয়োজিত মানববন্ধনে রাজনৈতিক দলের ব্যানার ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা চলছে।প্রশ্ন উঠছে, একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষককে ঘিরে অভিযোগের বিষয়টি যদি প্রশাসনিক বা প্রাতিষ্ঠানিক হয়ে থাকে, তাহলে রাজনৈতিক দলের ব্যানারে কর্মসূচি আয়োজনের প্রয়োজনীয়তা কী ছিল?তবে রাজনৈতিক দলের ব্যানার ব্যবহারের বিষয়টি থেকেই নূরুল ইসলাম বিএসসি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার মতো প্রমাণ এখনো সামনে আসেনি। বিষয়টি নিয়ে যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, সেটিও নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।একইভাবে নূরুল ইসলাম বিএসসির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকেও রাজনৈতিক বিরোধের কথা বলে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং ঘটনাটির সামগ্রিক প্রেক্ষাপট—দুটিই আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সাবেক শিক্ষার্থীদের ফেসবুক স্ট্যাটাসগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তাঁদের বক্তব্যের মূল জায়গাটি নূরুল ইসলাম বিএসসিকে অন্ধভাবে দায়মুক্ত করা নয়। বরং তাঁরা বলছেন, অভিযোগ থাকলে তদন্ত হোক এবং প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হোক।পাশাপাশি তাঁরা প্রশ্ন তুলছেন, চলমান বিরোধের পেছনে ব্যক্তিগত, প্রশাসনিক কিংবা রাজনৈতিক কোনো প্রেক্ষাপট রয়েছে কি না, সেটিও কি তদন্তের অংশ হওয়া উচিত নয়?অর্থাৎ, অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেমন প্রয়োজন, তেমনি অভিযোগের পেছনে অন্য কোনো বিরোধ বা প্রভাব থাকলে সেটিও প্রকাশ্যে আসা প্রয়োজন।এখন মূল প্রত্যাশা একটি নিরপেক্ষ ও নথিভিত্তিক তদন্তকে ঘিরে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা যেমন নির্ধারিত হতে পারে, তেমনি রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রভাবের কোনো ভূমিকা ছিল কি না, থাকলে তার প্রকৃতিও স্পষ্ট হতে পারে।
গাজীপুর উচ্চবিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা—ব্যক্তিগত আবেগ, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা পারস্পরিক বিরোধের বাইরে গিয়ে প্রকৃত সত্য সামনে আনা হোক। কোনো শিক্ষক দোষী হলে তাঁর বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক, আর অভিযোগের ভিত্তি না থাকলে সেটিও স্পষ্টভাবে জানানো হোক।গাজীপুর উচ্চবিদ্যালয় যেন কোনো বিরোধের কেন্দ্র নয়, বরং শিক্ষার পরিবেশ হিসেবেই তার মর্যাদা ধরে রাখতে পারে—এটাই সাবেক শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা।

Leave a Reply