‎‎গাজীপুরে পোশাক শিল্পে শ্রমিক আন্দোলনে পুলিশের গাড়িতে আগুন, আটক ৩০

‎‎গাজীপুরে পোশাক শিল্পে শ্রমিক আন্দোলনে পুলিশের গাড়িতে আগুন, আটক ৩০

গাজীপুর প্রতিনিধি


‎‎গার্মেন্টস শিল্পকে ধ্বংস এবং অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির জন্য কিছু দুষ্কৃতকারী তৎপরতা চালাচ্ছে। তাঁর অভিযোগ, বিদেশি ইন্ধনে অল্পসংখ্যক লোক বিভিন্ন কারখানায় গিয়ে উসকানিমূলক কথা বলে শ্রমিকদের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ‎ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণসহ বিভিন্ন দাবিতে গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভ ও সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে। ‎সোমবার (২ নভেম্বর) মহানগরীর নাওজোর এলাকায় পুলিশের একটি ভ্যানে আগুন দিয়েছে বিক্ষোভকারীরা। এ ছাড়া পুলিশের দুটি গাড়িসহ শতাধিক যানবাহন ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও লাঠিচার্জ করেছে।‎‎গতকাল থেকে সোমবার পর্যন্ত আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট ৩০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জেলায় ১০ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েনের পাশাপাশি ২১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করছেন।


‎‎ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ-২, গাজীপুরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন পিপিএম-সেবা জানান, সোমবার সকাল থেকে ভোগড়া, সফিপুর, কোনাবাড়ী, মালেকের বাড়িসহ বিভিন্ন স্থানে শ্রমিকরা জড়ো হয়ে আন্দোলনের চেষ্টা করেন। পুলিশ তাঁদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এ সময় পুলিশের একটি ভ্যানে অগ্নিসংযোগ এবং বিভিন্ন যানবাহন ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। কালিয়াকৈর এলাকাতেও একটি কাভার্ড ভ্যানে আগুন দেওয়ার কথা জানান তিনি।


‎‎পুলিশ সুপার বলেন, বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জ করেছে। গতকাল থেকে এ পর্যন্ত আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট ৩০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা ও দলীয় পরিচয় যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। সোমবার নাওজোর এলাকায় পুলিশের ভ্যানে আগুন দেওয়ার ঘটনায় ঘটনাস্থল থেকে একজনকে আটক করা হয়েছে।
‎‎এদিকে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক মোঃ শওকত হোসেন সরকার বলেছেন, শ্রমিকদের বেতন বাড়ানোর বিষয়ে সরকার, বিজিএমইএ, গার্মেন্টস মালিক ও শ্রমিকদের মধ্যে আলোচনায় ঐকমত্য হয়েছে। গতকাল মজুরি কমিশন গঠন করা হয়েছে এবং আগামী জানুয়ারি থেকে বর্ধিত বেতন কার্যকর হওয়ার আশা করছেন তিনি। ‎সোমবার দেওয়া বক্তব্যে প্রশাসক বলেন, গার্মেন্টস শিল্পকে ধ্বংস এবং অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির জন্য কিছু দুষ্কৃতকারী তৎপরতা চালাচ্ছে। তাঁর অভিযোগ, বিদেশি ইন্ধনে অল্পসংখ্যক লোক বিভিন্ন কারখানায় গিয়ে উসকানিমূলক কথা বলে শ্রমিকদের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।


‎‎তিনি বলেন, গার্মেন্টস শিল্প সচল থাকলে শ্রমিক ভাই-বোনেরা ভালো থাকবেন, গাজীপুর ভালো থাকবে এবং দেশও ভালো থাকবে। শ্রমিকদের দাবির সঙ্গে তিনিও একমত এবং সরকারও এ বিষয়ে উদ্যোগ নিয়েছে। তাই এখন আর আন্দোলনের প্রয়োজন নেই। শ্রমিকদের ধৈর্য ধারণ, শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা এবং কারখানায় কাজে মনোনিবেশ করার আহ্বান জানান তিনি।
‎‎সোমবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে কালিয়াকৈরের পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় প্রায় এক থেকে দেড় হাজার শ্রমিক মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে অবরোধ শুরু করেন। এতে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। গাজীপুর শিল্পাঞ্চল পুলিশের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন জানান, চন্দ্রা, পল্লী বিদ্যুৎ, সফিপুর, কোনাবাড়ী ও মৌচাকসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বিজিবি, শিল্প পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা মোতায়েন রয়েছেন। ‎গাজীপুর জেলা প্রশাসক মোঃ নূরুল করিম ভূঁইয়া ১০ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েনের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, ২১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে বিজিবি সদস্যরা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করবেন। ‎আন্দোলনের নামে যাতে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও সাধারণ মানুষের জানমালের ক্ষতি না হয়, সে লক্ষ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাঠে রয়েছে। অন্যান্য বাহিনীকেও প্রস্তুত রাখা হয়েছে। জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার (মিডিয়া ও রিসার্চ সেল) মোঃ আরিফ হোসাঈন ক্ষুদে বার্তায় বিজিবি মোতায়েনের তথ্য নিশ্চিত করেন। ‎এদিকে শ্রমিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে মহাসড়কে বিশৃঙ্খলা ও জনদুর্ভোগ এড়াতে ভোগড়া বাইপাস থেকে নাওজোর পর্যন্ত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে অবস্থান নিয়েছেন বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা। গাজীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে দলীয় নেতাকর্মীরা মহাসড়কের পাশে অবস্থান নেন। অন্যদিকে গাজীপুর মহানগর বিএনপির সভাপতি ও সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শওকত হোসেন সরকারের নেতৃত্বে কোনাবাড়ী ও কাশিমপুর এলাকায় নেতাকর্মীরা অবস্থান করেন।


‎‎গাজীপুর মেট্রো বাসন থানা বিএনপির সভাপতি তানভীর সিরাজ বলেন, মহাসড়কে যানবাহন চলাচল সচল রাখা, যাত্রীদের দুর্ভোগ কমানো এবং বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে ভোগড়া বাইপাস থেকে নাওজোর পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে বিএনপি নেতাকর্মীরা অবস্থান নিয়েছেন। ‎এর আগে রোববার সকালে ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে কালিয়াকৈরের মৌচাক, সফিপুর, চন্দ্রা ও পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় শ্রমিকরা বিক্ষোভ শুরু করেন। পরে হাজার হাজার শ্রমিক মহাসড়কে অবস্থান নিলে প্রায় সাড়ে ছয় ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ থাকে। দুপুর আড়াইটার দিকে পুলিশ ও বিজিবির তৎপরতায় যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। ‎রোববারের আন্দোলন চলাকালে পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় কয়েকটি কারখানার ফটকে ভাঙচুর এবং একটি কারখানার গুদামে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। মৌচাক এলাকায় ট্রাফিক পুলিশ বক্স ভাঙচুর করা হয়। কোনাবাড়ী ফ্লাইওভারের নিচে একটি পুলিশ বক্স এবং আনসার একাডেমির সামনে পুলিশের একটি পিকআপ ভ্যানে আগুন দেওয়া হয়। বিভিন্ন স্থানে শ্রমিক ও পুলিশের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। এতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, শ্রমিক ও সাংবাদিক আহত হন। ‎আন্দোলনের প্রভাবে রতনপুর, কোনাবাড়ী ও কাশিমপুরসহ আশপাশের শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ও ছুটি ঘোষণা করা হয়। শিল্প পুলিশের হিসাবে, রোববার দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত গাজীপুরে ১০০টি পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছিল। অন্যদিকে বিজিএমইএর হিসাবে, ঢাকা, সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর ও ময়মনসিংহের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চল মিলিয়ে ৫২৯টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছিল।
‎‎শ্রমিকদের দাবি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে বর্তমান মজুরিতে জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি অতিরিক্ত কাজের সুযোগ কমে যাওয়ায় আয়ও কমেছে। এ অবস্থায় মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ, চাকরিচ্যুত শ্রমিকদের পুনর্বহাল এবং শ্রমিকদের কালো তালিকাভুক্তি বন্ধসহ বিভিন্ন দাবি জানিয়ে আসছেন তাঁরা। শ্রমিকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে রোববার সরকার নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দিয়েছে।
‎

Leave a Reply

Your email address will not be published.