কাজল মালেক
১৫শ পর্ব
দক্ষিণ পাশ দিয়ে পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে শ্রীপুর পর্যন্ত যে রাস্তা গিয়েছে সেই প্রশস্থ রাস্তা ধরে কুচকাওয়াজ চলবে। ঢোলের দ্রিমদাম শব্দ শুনে উচ্চকিত হয় তহরজান। বুঝতে পারে কুচকাওয়াজ দল কাছে চলে এসেছে। এই রাস্তায় মার্চপাস্ট করতে করতে ওরা গাঁয়ের ছোট রাস্তাগুলোও প্রদক্ষিণ করবে। এভাবে ঘুরে পুরো গ্রামের মানুষকে তারা আনন্দ দিয়ে পাকিস্তান সৃষ্টির সাফল্যের বার্তা পৌঁছে দেবে। ড্রামের বাদ্য শুনে তহরজান শিহরিত হচ্ছে। ভীর আবেগে জয়গুনের হাতটা তার বুকের কাছে টেনে নেয় সে। বলে, “বুজান, দেহো, আমার শইল কেমুন করতাছে। বুকের মইধ্যে তুফান উঠতাছে। আহারে, আমি যদি আরও কাছে থাইয়া দেকতে পারতাম! দেহো,তোমার দেওরের খাকী পোশাক। তাইন হাফ শাট আর হাফ পেন্ট পইরা,মাতায় ক্যাপ দিয়া সাইজ্যা গুইজ্যা গেছুইন। মনে অইলো দারোগা সাব।”কথা শুনে হাসে জয়গুন,আরো ঘেঁষে দাঁড়িয়ে জানালা দিয়ে উঁকি দেয়।তহরজান বলতে থাকে,”তোমার দেওর নাহি সবচাইতে ভালা পিডি পারে। কমান্ডার তারে খুউব ভালা পায়। শব্দ হুনতাছনা, এহনি আইয়া পড়বো। দেইহো। বুজান, আমারে ধইরা দেহো,আমার বুক দরফর করতাছে। বেচারা রাইতে ঘুমায়নাই, কতকন বাদে বাদে উডে আর কয়, কাইল আমার বড় পরীকখা। ভালা করতে পারলে জয়দেবপুর নিবো। হেইহানে ভালা করলে আমারে মেডেল দিবো। আমি কইলাম , দেইহো, তোমার দেওর মেডেল পাইবো।” এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলে জয়গুনের দিকে তৃপ্তির দৃষ্টিতে তাকায় তহরজান। জয়গুন স্মিত হেসে, বলে, ” তর জামাইরে তর খুব মনে লয়, না?” “তোমার জামাইরে তোমার মনে লয় না?””তর কি মনে অয়?”
হেসে কুটি কুটি যায় তহরজান। জয়গুনের পেটে হাত দিয়ে শুনায়,”পেডেই ত তার সাক্ষী দেয়।”
“দ্যাক দ্যাক উছসব পার্টি আইয়া পড়ছে। বাছির কমান্ডার হগগলের আগে। কী তার ভঙ্গি। হুটহাট কইরা আডে আর ইশারায় কতা কয়। ধমক মারে। কতো ঢং যে জানে। বেডাই একটা।” আবার জানালা ঘেঁষে দাঁড়ায় তারা। কুচকাওয়াজ আর ড্রামের শব্দে সচকিত চারদিক। দু’জনের চোখ খুঁজছে একজনকে। কমান্ডারের পেছেন বাদকদল। ঢোলের উপর ঢুলীর ঘন ঘন আঘাতে সুর তরঙ্গের সৃষ্টি হচ্ছে। একদল সুসজ্জিত যুবক সেই শব্দসুরের সঙ্গে তালমিলিয়ে হাতে পায়ের অসাধারণ ছন্দ তুলে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বাছিরের মুখে হুইসেল। ফুঁ দিয়ে সতর্ক করছেন। আবার বাঁশি হাতে নিয়ে নির্দেশ দিচ্ছেন, ” মাথা উঁচা, বুক টান,বাম ডান, বাম ডান। এগিয়ে চলো বাম ডান, বাম ডান।” সবার আগে থেকে কেমনে দুবাহু আগে পিছে নিয়ে পায়ের সঙ্গে তালমিলিয়ে এগিয়ে যেতে হয় তা দেখিয়ে দিচ্ছেন। তহরজানের চোখ পড়ে জুমনের উপর। রুদ্ধশ্বাসে দেখে তার মাথায় কালো রংয়ের পুলিশি ক্যাপ, পরনে মেটে রংয়ের খাকী হাফশার্ট আর হাফ প্যান্ট। দুই বাহু দুলিয়ে বুক টান টান করে মাথা তুলে দলের সঙ্গে বীরের মতো এগিয়ে যাচ্ছে জুমন। বামদিকের লাইনের সর্বাগ্রে সে।”তোমার দেওরেরে কী সুন্দর লাগতাছে গো, বুজান, মনে অইতাছে রাজা-বাশশা “- তহরজানের কন্ঠে আবেগের কাঁপন। জয়গুন তাকে ধাক্কা দেয়, বলে, “থাম দেহি। নজর লাগবো আবার।”
স্যার রেডক্লিফকে বৃটেন থেকে ডেকে আনা হয়েছে। পাকিস্তান ভারতের সীমানা নির্ধারণের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তাকে।
পাক-ভারত সীমানা আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৪৭ সালের ১৭ই আগস্ট নির্ধারণ চূড়ান্ত করা হয়। তার আগে রেডক্লিফকে বর্ডার কমিশনের চেয়ারম্যান করা হয়েছিলো।
ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সীমানা নির্ধারণকারী রেখাটি ‘র্যাডক্লিফ লাইন’ নামে পরিচিত। সীমানা কমিশন বা বর্ডার কমিশনের চেয়ারম্যান স্যার সিরিল র্যাডক্লিফের নামানুসারে এই সীমানারেখার নামকরণ করা হয়েছিলো।১৪ই আগস্ট পাকিস্তান এবং ১৫ই আগস্ট ভারত স্বাধীন হলেও সীমানা কমিশন তাদের চূড়ান্ত রায় ১৭ই আগস্ট প্রকাশ করে।এই সীমান্তরেখার নির্দেশনা অনুযায়ী ব্রিটিশ-শাসিত ভারতের পাঞ্জাব ও বেঙ্গল (বাংলা) প্রদেশকে দ্বিখণ্ডিত করা হয়।
মাউন্ট ব্যাটেন রেডক্লিফকে নিয়োগের ব্যবস্থা করেছিলেন। জওহরলাল নেহরু আর মাউন্ট ব্যাটেনের পরামর্শে প্রতিটি দেশীয় রাজ্য যা নতুন করে ভারতের অন্তর্ভুক্ত হবে তার মানচিত্র এবং প্রতিটি প্রদেশের স্বতন্ত্র মানচিত্র নিয়ে তিনি সীমান্ত রেখা তৈরি করেন। মূলত পাঞ্জাব ও বেঙ্গল প্রদেশকে বিভক্ত করে রেডক্লিফ লাইন প্রস্তুত করা হয়। ভারতের অন্যান্য অংশে বা অন্য কোন প্রদেশে মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় সেখানে রেডক্লিফ সীমানা রেখার প্রয়োজন পড়েনি। ভারতের সামান্য অংশ নিয়ে এইভাবে একটি স্বতন্ত্র ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ে তোলা ছিলো ঐতিহাসিক ভুল। এতে ভারতের অন্যান্য প্রদেশ ও দেশীয় রাজ্যের আর সব মুসলমানগন অসহায় ও নিদারুন সংখ্যালগুতে পরিণত হয়। এবং তারা নিয়মিত নির্যাতনের সম্মুখীন হয়। পাকিস্তান সৃষ্টি না হলে ভারতের মুসলিম ও হিন্দুদের স্বীকৃত সংখ্যাগত অবস্থান নিয়ে কারও উপেক্ষা করার সুযোগ ছিলো না। অন্তত ন্যুনতম ভারসাম্য ছিলো। শাসন ব্যবস্থায় মুসলিমদের প্রশ্নাতীত ভূমিকা ভারতকে শাসনতান্ত্রিক ভাবে মেনে নিতে হতো। পূর্ব বাংলা পাকিস্তানের অংশ হয়ে এক বাংলা থেকে বিভক্ত হয়ে গেলে পশ্চিম বাংলার মুসলমানদের উপর অবর্ণনীয় অত্যাচার নেমে আসে। পূর্ব বাংলায়ও তার প্রভাব পড়ে। শুরু হয় হিন্দু মুসলিম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, যা বায়ুতাড়িত আগুনের লেলিহানের মতো সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়ে। বিভক্ত বাংলা,বিহার ও বিভক্ত পাঞ্জাবের উভয় অংশের এই নারকীয় দাঙ্গায় ভারত ও পাকিস্তানের লক্ষ লক্ষ মানুষ নিহত হয়, এবং কোটি কোটি মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়ে।
পরিসংখ্যান বলে,অনুমান অনুসারে, দেশভাগের সময় দাঙ্গায় ২ লাখ থেকে ১০ লাখ বা তার বেশি মানুষ নিহত হয়েছিল।সবচেয়ে ভয়াবহ দাঙ্গা হয়েছিল পাঞ্জাব প্রদেশে। এছাড়া বাংলা এবং বিহারেও ব্যাপক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছিল। এতে লক্ষ লক্ষ মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি হারিয়ে বাস্তুচ্যুত এবং নিজ দেশ থেকে বিতাড়িত হয়।
শুধু পশ্চিম সীমান্ত পাঞ্জাবে নয়, পূর্ব দিকেও পূর্ব পাকিস্তানে সাম্প্রদায়িক হাঙ্গামায় বিপুলসংখ্যক মানুষ মারা যায়। কোন কোন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী এই দাঙ্গায় প্রায় ১কোটি ৫০ লক্ষ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছিল এবং ১০লক্ষ থেকে ২০ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। এটি ছিল মানব ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ ও বেদনাদায়ক বাস্তুচ্যুতির ঘটনা।রেডক্লিফ লাইনের সীমানা নির্ধারণও এই দাঙ্গার একটি কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়। এই দাঙ্গার ফলে হিন্দু ও মুসলমানের হৃদয়ে বিভেদের যে দাগ পড়েছিলো, ভেতরে বাইরে অন্তরজুড়ে যে রক্তাক্ত ক্ষত সৃষ্টি হয়ছিলো তার রক্তক্ষরণ এখনো থামেনি। একসময় ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে গড়ে ওঠা দুই স্বজনপ্রতীম সম্প্রদায়ের মধ্যে এই দাঙ্গায় জন্ম নিলো প্রতিহিংসা, অবিশ্বাস আর প্রতিশোধের পৈশাচিক উন্মাদনা।এই আত্মঘাতী দাঙ্গা ভারতের ইতিহাসে একটি কলঙ্কিত অধ্যায়।
ভারতের মুসলমান প্রধান এলাকাগুলো আগেই চিহ্নিত করে রাখা হয়েছিলে। বাংলার পূর্বাঞ্চল, মুর্শিদাবাদ ও আসাম মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা। কিন্তু সদ্য স্বাধীন ভারত আসাম ও মুর্শিদাবাদ তাদের বলে আগেই দাবী তুলেছে। মুর্শিদাবাদের অধিবাসীরা পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে একীভূত হতে চায়। তারা ভারতের সিদ্ধান্ত না মানার ঘোষণা দিয়ে আন্দোলনে নেমেছে। ভারতের স্বাধীনতা ঘোষণার পরও তিনদিন পর্যন্ত মুর্শিদাবাদের ঘরে ঘরে পাকিস্তানের চাদঁতারা পতাকা উড্ডীন ছিলো। নয়া ভারতের সেনাবাহিনী আর পুলিশ সে আন্দোলন নির্মম শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে স্তব্ধ করে দেয়।পাকিস্তানের সঙ্গে থাকার আন্দোলনের অসংখ্য কর্মীকে ধরপাকড় ও হত্যা করা হয়। স্থানীয় অধিবাসীদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে মুর্শিদাবাদ থেকে পাকিস্তানের চাঁদতারা খচিত পতাকা নামিয়ে সেখানে ভারতের তেরঙ্গা পতাকা উড়িয়ে দেয়া হলো। তেমনি করে নব্য গণতান্ত্রিক স্বৈরাচার মাউন্ট ব্যাটেন,রেডক্লিফ আর পন্ডিত জওহরলাল নেহরুর বিতর্কিত সিদ্ধান্তে আসামের মুসলমানদের প্রত্যাশার স্বপ্নও গুঁড়িয়ে দিলো। পূর্ববাংলা তখন পূর্ব পাকিস্তান নামে পরিচিত। রেডক্লিফ মানচিত্র হাতে মাউন্ট ব্যাটেনকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, যেসব এলাকায় মুসলিম সংখ্যাধ্যিক্য সেসব এলাকা পূর্ব পাকিস্তানের অংশ হবে বোঝা গেলো। আর যেখানে কোন জনবসতি নেই যেমন পাহাড়, নদী, বিস্তীর্ণ খোলামাঠ আর অরণ্যবনভূমি সেখানটা কিভাবে বিভাজন করা হবে? মাউন্ট ব্যাটেন যা জানালেন তার মর্মার্থ হলো কোন বিতর্ক না তুলে সে অঞ্চলটা ভারতের অংশ করে দেয়া হোক। অর্থাৎ নদী,আর অরণ্য পাহাড়ের শেষ প্রান্ত থেকে পূর্ব পাকিস্তানের সীমানা শুরু হবে। অতপর ১৭ আগস্ট, ১৯৪৭, মাউন্টব্যাটেনের নির্দেশনায় পূর্ব পরিকল্পনা মতো র্যাডক্লিফ লাইন বা সীমানা নির্ধারণে ভৌগোলিক সুবিধা, প্রশাসনিক অখণ্ডতা এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলোর নিরাপত্তার প্রশ্ন তুলে অধিকাংশ সীমান্ত পাহাড় ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেলো। আসাম, ত্রিপুরা ও মিজোরামের পাহাড়ী এলাকাগুলো তৎকালীন প্রশাসনিক কেন্দ্র থেকে সুবিধাজনক দূরত্বের কারণ দেখিয়ে কৌশলে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
পাহাড়গুলো ঐতিহাসিকভাবে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মেঘালয়, আসাম, ত্রিপুরা প্রাকৃতিক সীমানা হিসেবে গণ্য করা হতো, যা সমতল ভূমি থেকে ভিন্ন।মাউন্ট ব্যাটেন সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে উত্তর-পূর্ব ভারতের পাহাড়ী জাতিগোষ্ঠী ও প্রশাসনিক অঞ্চলগুলোকে ভারতের অংশ হিসেবেই বেশি কার্যকর মনে করেছিলেন।সে অনুযায়ী রেডক্লিফ কমিশন সীমান্তবর্তী অধিকাংশ পাহাড়ী এলাকা সমতল ভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন করে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করে। যদিও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পাহাড়ের পাদদেশ বা পাদদেশের কাছের সমতল ভূমি বাংলাদেশের অংশে পড়েছে তবু মূল পাহাড়ী উঁচু এলাকাগুলো ভারতের অন্তর্ভুক্তই রাখা হয়। মানে পাহাড়, পাহাড়ের সম্পদ ভারতের আর পূর্ব পাকিস্তানসংলগ্ন পাহাড়ের পাদদেশ থেকে পরবর্তী অংশ পূর্ব পাকিস্তানের। যার ফলে পাহাড়ের মূল্যবান ফসল, বনজসম্পদ ভারতের ভাগে পড়লো আর পাহাড় থেকে উদ্ভুত ক্ষতিকর দিকগুলোর ভার নিতে হলো পূর্ব পাকিস্তানকে। বৈশাখের বৃষ্টিতে কিংবা বর্ষার অতি বর্ষণে মেঘালয় ও আসামের পাহাড়ে জমে থাকা পানি প্রবল স্রোত ধরে ঢালুতে এসে পূর্ব পাকিস্তানের সুনামগঞ্জ, সিলেট ও নেত্রকোনার বিস্তীর্ণ অঞ্চল জলমগ্ন করে। পানির উন্মত্ত স্রোত স্থানীয় রাস্তাঘাট, পুল,ব্রীজ, বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে দেয়। বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে জনপদ। উজানের পাহাড়ী ঢল সমতলে নেমে এসে এমনি করে প্রতিবছর ডুবিয়ে দেয় বিপুল ফসলের জমি। ঘরে তোলার আগেই কৃষকের স্বপ্নের ফসল স্রোতে ভেসে যায়। যার ধকল নিম্নভূমি বা ভাটির দেশের মানুষকে সইতে হয়। আবার ভারত কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢলের মতো পূর্ব পাকিস্তানের সংলগ্ন ফসলের জমিতে নেমে আসে বুনো হাতির দল। হাতির পালের পদভারে তছনছ হয় তাদের ক্ষেতের ফসল। বাড়ে বন্যজন্তুর উপদ্রব। প্রাকৃতিক বানভাসি ও মানবৃষ্ট উপদ্রবের ফলে অপ্রতিরোধ্য এই অকাল দুর্যোগের কবল থেকে রক্ষা পায়না তারা অধিকন্তু দুর্ভিক্ষের মুখে পড়ে পূর্ব পাকিস্তান।
সীমানা নির্ধারণের এই শুভঙ্করের খেলায় কোনরকম উচ্যবাচ্য ছাড়াই জিতে যায় ভারত। পাকিস্তানের শাসকবর্গ পাঞ্জাব সীমান্তরেখা সম্পাদন নিয়ে মশগুল থাকেন তারা। পূর্ব সীমান্তে মাউন্ট ব্যাটেন আর রেডক্লিফের পক্ষপাতমূলক সিদ্ধান্তে সীমানা নির্ধারণে ভারত যে পুকুর চুরি করছে সেদিকে তাদের কোন নজর ছিলোনা বরং কিভাবে পশ্চিম পাকিস্তানের সীমানা সামান্য বাড়িয়ে নেয়া যায় তাই নিয়ে দেন-দরবার করতে ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠেন তারা। স্বার্থের কারণে কি পাকিস্তান কি ভারত কেউ পূর্ব বাংলা তথা পূর্ব পাকিস্তানের বন্ধু হতে পারেনি। পরবর্তী কালে পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকেরা পূর্ব বাংলাকে কলোনির মতো বানিয়ে তার সম্পদ লুঠ করে নিয়ে করাচি, লাহোর,পাঞ্জাব, ইসলামাবাদকে সমৃদ্ধ করেছে। শোষণের হাতিয়ার হিসেবে ক্ষমতা কুক্ষিগত রেখেছে তারা। গোড়া থেকেই পূর্ব পাকিস্তান অপুষ্টি ও রূগ্ন শিশুর মতো ধুকতে ধুকতে দিন পার করছে আর এদিকে তার অর্থনীতি ভঙ্গুর থেকে তলানীতে এসে পৌঁছেছে। পশ্চিম পাকিস্তান ও ভারতের কাছে পূর্ব পাকিস্তান ছিলো পাড়াতুতো ভাতৃবধূর মতো। তার রূপ-মাধুর্য, সৌন্দর্য সম্পদ ভোগে যখন মশগুল পাকিস্তান তখন হিংসার অনলে জ্বলে পুড়ে ভারত সুযোগ খুঁজছে কিভাবে পাকিস্তানকে হটিয়ে পূর্ব বাংলায় আধিপত্য বিস্তার করে তার সম্পদে ভাগ বসানো যায়।
তবু এক পাকিস্তানের স্বার্থের কথা বিবেচনা করে পূর্ব বাংলা প্রতিহিংসায় উন্মত্ত হয়নি। ভারতের অংশ পশ্চিম বাংলা তো বাংলারই অংশ। সেই কথা মাথায় রেখেই সকল বিভাজনকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে সীমান্ত প্রহরীদের কটাক্ষ এড়িয়ে পূর্ব বাংলা পশ্চিম বাংলার ভ্রাতৃত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করেছে।
Leave a Reply