
নজমুল হক,গাজীপুরঃ
বাংলাদেশ আজ যে সম্ভাবনার মোড়ে দাঁড়িয়ে, তার সবচেয়ে বড় ভিত্তি দেশের বিপুল যুব জনসংখ্যা। পৃথিবীর অনেক দেশ যখন ক্রমশ বয়স্ক জনগোষ্ঠীর চাপে অর্থনৈতিক সংকটে পড়ছে, তখন বাংলাদেশ এখনও তরুণদের দেশ। এই তরুণরাই হতে পারে অর্থনীতির গতি, উদ্ভাবনের শক্তি এবং উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি। কিন্তু বাস্তবতা হলো—এই বিপুল যুব শক্তির একটি বড় অংশ এখনও বেকার, দক্ষতাহীন ও হতাশ। ফলে যে জনশক্তি দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ হওয়ার কথা, তার একটি অংশ ধীরে ধীরে বোঝায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছে। তাই এখন সময় এসেছে যুব শক্তিকে শুধু রাজনৈতিক স্লোগান হিসেবে নয়, জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রীয় শক্তি হিসেবে দেখার।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট জনগোষ্ঠীর বড় অংশই তরুণ। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল বহুবার বলেছে, বাংলাদেশের “ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড” বা জনমিতিক সুবিধা উন্নয়নের জন্য একটি ঐতিহাসিক সুযোগ। অর্থাৎ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা যখন নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর তুলনায় বেশি থাকে, তখন সঠিক পরিকল্পনা থাকলে অর্থনীতিতে বড় ধরনের অগ্রগতি সম্ভব হয়। দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর কিংবা মালয়েশিয়ার উন্নয়নের পেছনেও যুব শক্তিকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তরের বড় ভূমিকা ছিল। বাংলাদেশও সেই সুযোগের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—আমরা কি সেই সুযোগকে কাজে লাগাতে পারছি? বর্তমান বাস্তবতা আশাব্যঞ্জক নয়। দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। প্রতিবছর লাখ লাখ তরুণ বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ থেকে বের হলেও শ্রমবাজারে তাদের জন্য পর্যাপ্ত কাজ নেই। অনেক ক্ষেত্রে চাকরির বাজারে যে দক্ষতার চাহিদা রয়েছে, শিক্ষাব্যবস্থা তা তৈরি করতে পারছে না। ফলে সনদ আছে, কিন্তু কাজ নেই—এমন এক বাস্তবতায় পড়ছে তরুণ সমাজ। উচ্চশিক্ষা অর্জনের পরও যখন চাকরি মিলছে না, তখন হতাশা ও অনিশ্চয়তা তরুণদের গ্রাস করছে।
শুধু তাই নয়, দক্ষতার অভাবও বড় সংকট। বিশ্ব অর্থনীতি এখন চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে প্রবেশ করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন, রোবোটিক্স, তথ্যপ্রযুক্তি ও ডিজিটাল অর্থনীতি বিশ্ব শ্রমবাজারকে বদলে দিচ্ছে। অথচ বাংলাদেশের অধিকাংশ তরুণ এখনও সেই পরিবর্তনের জন্য পর্যাপ্তভাবে প্রস্তুত নয়। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এখনও অনেকাংশে মুখস্থনির্ভর, পরীক্ষাকেন্দ্রিক ও চাকরিনির্ভর। ফলে সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা ও প্রযুক্তিগত জ্ঞান পর্যাপ্তভাবে গড়ে উঠছে না।
এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—যুব শক্তিকে আমরা কীভাবে উন্নয়নের চালিকাশক্তিতে পরিণত করব? প্রথমত, শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগোপযোগী ও দক্ষতাভিত্তিক করতে হবে। শুধু সনদনির্ভর শিক্ষা দিয়ে বর্তমান বিশ্বের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব নয়। প্রযুক্তি, কারিগরি শিক্ষা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, গবেষণা ও উদ্ভাবনকে শিক্ষার মূলধারায় আনতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শুধু ডিগ্রি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান নয়, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
দ্বিতীয়ত, কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। উন্নত দেশগুলোতে তরুণদের বড় অংশ দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার মাধ্যমে দ্রুত কর্মসংস্থানে যুক্ত হয়। বাংলাদেশেও ইঞ্জিনিয়ারিং, আইটি, অটোমোবাইল, কৃষি প্রযুক্তি, ইলেকট্রিক্যাল ও স্বাস্থ্যসেবাভিত্তিক কারিগরি প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়াতে হবে। এখনও আমাদের সমাজে কারিগরি শিক্ষাকে অনেক ক্ষেত্রে “দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষা” হিসেবে দেখা হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো জরুরি।
তৃতীয়ত, তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। দেশের অধিকাংশ শিক্ষিত তরুণ এখনও চাকরির অপেক্ষায় থাকে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—সরকার একা কখনো সবার চাকরি নিশ্চিত করতে পারবে না। তাই তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। সহজ শর্তে ঋণ, স্টার্টআপ সহায়তা, ব্যবসায়িক প্রশিক্ষণ ও বাজারসুবিধা নিশ্চিত করা গেলে লাখো তরুণ উদ্যোক্তা হতে পারবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, কৃষিভিত্তিক শিল্প, অনলাইন ব্যবসা এবং ডিজিটাল সেবাখাত নতুন কর্মসংস্থানের বড় ক্ষেত্র হতে পারে।বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সিং ও আইটি খাতও আশার বড় আলো। বর্তমানে হাজার হাজার তরুণ বিদেশি প্রতিষ্ঠানের জন্য অনলাইনে কাজ করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছেন। কিন্তু এই খাতে দক্ষতার ঘাটতি এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। ইংরেজি ভাষা দক্ষতা, আধুনিক প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ ও আন্তর্জাতিক মানের আইটি শিক্ষা নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ বৈশ্বিক ডিজিটাল অর্থনীতিতে আরও বড় অবস্থান নিতে পারবে।
কৃষিখাতেও তরুণদের সম্পৃক্ত করা জরুরি। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও কৃষি উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন প্রাণ ফিরিয়ে আনা সম্ভব। বর্তমানে অনেক শিক্ষিত তরুণ কৃষিতে নতুন উদ্যোগ নিয়ে সফল হচ্ছেন। এই প্রবণতা বাড়াতে সরকারি সহায়তা ও সামাজিক স্বীকৃতি দুটোই প্রয়োজন।তবে শুধু অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি করলেই হবে না; তরুণদের মানসিক ও সামাজিক বিকাশের দিকেও নজর দিতে হবে। দীর্ঘদিন বেকার থাকার কারণে অনেক তরুণ হতাশা, বিষণ্নতা ও আত্মবিশ্বাসহীনতায় ভুগছে। কেউ কেউ অপরাধ, মাদকাসক্তি বা চরমপন্থার দিকেও ঝুঁকছে। তাই যুব উন্নয়নকে কেবল অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক ও মানবিক উন্নয়নের অংশ হিসেবেও দেখতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি দূর করা। যখন যোগ্য তরুণ চাকরি পায় না, আর অযোগ্য ব্যক্তি প্রভাব বা অর্থের জোরে সুযোগ পায়, তখন পুরো সমাজে হতাশা তৈরি হয়। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, মেধার মূল্যায়ন ও সমান সুযোগ নিশ্চিত না হলে যুব শক্তিকে উন্নয়নের শক্তিতে রূপান্তর করা সম্ভব নয়।বাংলাদেশের ইতিহাস প্রমাণ করে, তরুণরাই সব বড় পরিবর্তনের অগ্রদূত। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন—সবখানেই যুব সমাজ ছিল নেতৃত্বে। সেই তরুণদের শক্তিকে যদি দক্ষতা, জ্ঞান ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে গড়ে তোলা যায়, তবে তারাই হতে পারে স্মার্ট, সমৃদ্ধ ও আত্মনির্ভর বাংলাদেশের প্রধান নির্মাতা।
আজকের বিশ্বে যে জাতি তার যুব শক্তিকে কাজে লাগাতে পারে, সেই জাতিই এগিয়ে যায়। আর যে জাতি তার তরুণদের হতাশা, বেকারত্ব ও অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে রাখে, সে জাতি পিছিয়ে পড়তে বাধ্য। তাই এখনই সময়—যুব শক্তিকে জাতীয় উন্নয়নের মূলধারায় নিয়ে আসার। কারণ বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আজকের তরুণদের ওপরই। যুব শক্তিই হোক দেশের উন্নয়নের চালিকাশক্তি—এটি শুধু একটি স্লোগান নয়; এটি হওয়া উচিত রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন দর্শন।

Leave a Reply