সিজারের তিন দিন পরই কোলের শিশুকে রেখে দাখিল পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন মা

সিজারের তিন দিন পরই কোলের শিশুকে রেখে দাখিল পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন মা

স্টাফ রিপোর্টার মোঃ রেজাউল করিম কুড়িগ্রাম

​মাতৃত্বের আনন্দ আর পরীক্ষার প্রস্তুতি—সাধারণত এই দুইয়ের ভার একসাথে সামলানো কঠিন। কিন্তু সেই অসাধ্যকেই সাধন করে দেখালেন কুড়িগ্রামের অদম্য এক তরুণী হাওয়া আক্তার। পেটে অস্ত্রোপচারের ক্ষত আর শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা নিয়ে, মাত্র তিন দিনের নবজাতককে সঙ্গে করে দাখিল পরীক্ষার হলে বসে অনন্য এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তিনি।

​কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার ঘোগাদহ ইউনিয়নের বাসিন্দা হযরত আলীর মেয়ে হাওয়া আক্তার। এ বছর তিনি দাখিল পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন। গত ১৮ এপ্রিল এক ফুটফুটে সন্তান জন্ম দেন তিনি। সিজারিয়ান অপারেশনের পর যেখানে চিকিৎসকরা পূর্ণ বিশ্রামের পরামর্শ দেন, সেখানে হাওয়ার চোখে ছিল ভিন্ন স্বপ্ন। শারীরিক দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার আগেই তিনি সিদ্ধান্ত নেন পরীক্ষায় বসার। কারণ, একটি বছর পিছিয়ে যাওয়া মানে তার স্বপ্নপূরণের পথে বড় এক বাধা।

​মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) কুড়িগ্রাম আলিয়া কামিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায় এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। সকালে যখন পরীক্ষার্থীরা হলে প্রবেশ করছিলেন, তখন হাওয়া আক্তারের কোলে ছিল মাত্র তিন দিনের এক নবজাতক। পরীক্ষার সময় শুরু হলে তিনি কোলের শিশুকে পরিবারের সদস্যদের জিম্মায় দিয়ে প্রবেশ করেন হলে।

​”সিজারের পর প্রচণ্ড শারীরিক কষ্ট হচ্ছিল, কিন্তু আমি মনোবল হারাইনি। আমার লক্ষ্য ছিল পরীক্ষা দেবই। আল্লাহর রহমতে ভালোভাবে ‘কুরআন মাজিদ ও তাজভীদ’ পরীক্ষা শেষ করতে পেরেছি।”

হাওয়া আক্তার

​পরীক্ষা চলাকালীন সময়টুকুতে নবজাতক শিশুটিকে নিয়ে কেন্দ্রের পাশের একটি কক্ষে অপেক্ষা করছিলেন পরিবারের সদস্যরা। একদিকে মা হলের ভেতরে কলম চালিয়ে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ছিলেন, অন্যদিকে বাইরে চলছিল সন্তানের যত্ন। বিরতির ফাঁকে বা পরীক্ষা শেষে দ্রুত সন্তানের কাছে ছুটে যাওয়ার সেই দৃশ্য উপস্থিত সবাইকে আবেগাপ্লুত করে তোলে।

​হাওয়া আক্তারের এই দৃঢ়তা শুধু সাধারণ মানুষের নজর কাড়েনি, বরং কেন্দ্র সংশ্লিষ্টদেরও বিস্মিত করেছে। কুড়িগ্রাম আলিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ও কেন্দ্র সচিব মাওলানা মুহাম্মদ নুর বখত মিঞা বলেন,

​”আমাদের কেন্দ্রে প্রায় ১১০০ পরীক্ষার্থী অংশ নিচ্ছে। তবে এই ছাত্রীটি যা করে দেখিয়েছে, তা সত্যিই ব্যতিক্রমী। সিজারের মাত্র তিন দিন পর পরীক্ষায় অংশ নেওয়া তার গভীর ইচ্ছাশক্তির পরিচয় দেয়। এটি অন্য শিক্ষার্থীদের জন্য বড় একটি অনুপ্রেরণা।”

​স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, প্রতিকূল পরিস্থিতির অজুহাতে অনেকেই যেখানে পড়াশোনা ছেড়ে দেন, সেখানে হাওয়া আক্তার প্রমাণ করেছেন—ইচ্ছাশক্তি থাকলে কোনো বাধাই অজেয় নয়। তার এই হার না মানা মানসিকতা কুড়িগ্রামের শিক্ষাঙ্গনে এক পজিটিভ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

​হাওয়া আক্তারের পরিবার আশা করছেন, তিনি শুধু এই পরীক্ষাতেই সফল হবেন না, বরং আগামীতে একজন সুশিক্ষিত মা হিসেবে সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখবেন। এই সাহসী মা এবং তার নবজাতকের সুস্থতা কামনা করছেন কুড়িগ্রামবাসী।

Leave a Reply

Your email address will not be published.