
নজমুল হক, গাজীপুর
একটি দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার মানুষ। সেই মানুষকে গড়ে তোলে শিক্ষা। তাই শিক্ষার মান ভালো হলে দেশের মানও বাড়ে। আর শিক্ষার মান খারাপ হলে উন্নয়নের গতি থেমে যায়। এ কারণেই বলা হয়, শিক্ষার মানেই জাতির মান। বাংলাদেশ আজ উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশ গড়ার স্বপ্ন দেখছে। অর্থনীতি এগোচ্ছে। নতুন নতুন সড়ক, সেতু ও শিল্পকারখানা তৈরি হচ্ছে। প্রযুক্তির ব্যবহারও বাড়ছে। কিন্তু এসব উন্নয়ন দীর্ঘস্থায়ী হবে না, যদি দক্ষ ও সৎ মানবসম্পদ তৈরি না হয়। আর সেই কাজটি করতে পারে শুধু একটি মানসম্মত শিক্ষা ব্যবস্থা। স্বাধীনতার পর শিক্ষা খাতে বাংলাদেশ অনেক এগিয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশের সাক্ষরতার হার এখন ৭৫ শতাংশের বেশি। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি প্রায় শতভাগ। দেশে সরকারি, বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক মিলিয়ে ১৭৭টি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। হাজার হাজার স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা শিক্ষাদান করছে। সংখ্যার দিক থেকে এটি বড় অর্জন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, শিক্ষার মান কি বেড়েছে? বাস্তবতা বলছে, এখনও অনেক পথ বাকি। বিশ্বব্যাংক ও ইউনেস্কোর বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের অনেক শিশু প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করেও ঠিকমতো পড়তে, লিখতে বা সহজ অঙ্ক করতে পারে না। শিক্ষাবিদরা একে “শেখার সংকট” বলে উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ শিশুরা স্কুলে যাচ্ছে, কিন্তু প্রত্যাশিত শিক্ষা পাচ্ছে না।
মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরেও একই সমস্যা রয়েছে। এখনও মুখস্থবিদ্যার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়াই যেন মূল লক্ষ্য। কিন্তু জীবন শুধু পরীক্ষার খাতা নয়। বাস্তব জীবনে দরকার যুক্তি, বিশ্লেষণ, সৃজনশীলতা এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা। এসব বিষয়ে আমাদের শিক্ষার্থীরা অনেক ক্ষেত্রেই পিছিয়ে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও একই চিত্র দেখা যায়। প্রতিবছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করছে। কিন্তু তাদের অনেকেই চাকরি পাচ্ছে না। আবার অনেক প্রতিষ্ঠান দক্ষ কর্মী খুঁজে পাচ্ছে না। এর অর্থ হলো শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রের মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপে দেখা যায়, তরুণদের বেকারত্বের হার জাতীয় গড়ের তুলনায় বেশি। অন্যদিকে তথ্যপ্রযুক্তি, প্রকৌশল, কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা ও শিল্পখাতে দক্ষ জনশক্তির চাহিদা বাড়ছে। এই ব্যবধান দূর করতে শিক্ষা ব্যবস্থাকে নতুনভাবে সাজাতে হবে।আজ বিশ্ব দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিক্স, ডেটা সায়েন্স ও ডিজিটাল প্রযুক্তি কর্মক্ষেত্রের চেহারা পাল্টে দিচ্ছে। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী কয়েক বছরে বহু নতুন ধরনের কাজ সৃষ্টি হবে। আবার অনেক পুরোনো কাজ হারিয়ে যাবে। তাই ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষার্থীদের এখন থেকেই প্রস্তুত করতে হবে।
শুধু বই পড়লেই হবে না। প্রযুক্তি জানতে হবে। ইংরেজিতে দক্ষ হতে হবে। যোগাযোগের দক্ষতা বাড়াতে হবে। দলবদ্ধভাবে কাজ করতে শিখতে হবে। উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিকতাও গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষার মান নির্ভর করে শিক্ষকের ওপর। একজন ভালো শিক্ষক একটি প্রজন্মকে বদলে দিতে পারেন। তাই শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে শিক্ষকদের দক্ষ করে তুলতে হবে। ভালো শিক্ষক তৈরি না হলে ভালো শিক্ষার্থীও তৈরি হবে না।পাঠ্যক্রমেও পরিবর্তন আনা জরুরি। শুধু তথ্য মুখস্থ করানো যাবে না। বাস্তবমুখী শিক্ষা দিতে হবে। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, কৃষি, পরিবেশ, নৈতিকতা, গবেষণা ও উদ্ভাবনের ওপর বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করতে শেখাতে হবে। নতুন কিছু ভাবতে উৎসাহ দিতে হবে। গবেষণার দিকেও গুরুত্ব বাড়াতে হবে। উন্নত দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণার মাধ্যমে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করে। নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ দিতে হবে। আধুনিক গবেষণাগার গড়ে তুলতে হবে। আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা বাড়াতে হবে। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে আরও জনপ্রিয় করতে হবে। দক্ষ কারিগরি জনশক্তি ছাড়া শিল্পায়ন সম্ভব নয়। উন্নত দেশগুলো এই খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। বাংলাদেশেও সেই পথ অনুসরণ করতে হবে।
শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোও জরুরি। দীর্ঘদিন ধরেই বিশেষজ্ঞরা শিক্ষা খাতে আরও বেশি বরাদ্দের দাবি জানিয়ে আসছেন। শুধু ভবন নির্মাণ করলেই হবে না। শিক্ষার মান উন্নয়নে বিনিয়োগ করতে হবে। শিক্ষক, গবেষণা, ল্যাবরেটরি, গ্রন্থাগার ও ডিজিটাল শিক্ষা ব্যবস্থায় বেশি অর্থ ব্যয় করতে হবে। ফিনল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের মতো দেশগুলো শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়েই আজ বিশ্বের উন্নত দেশের কাতারে পৌঁছেছে। তাদের প্রাকৃতিক সম্পদ খুব বেশি ছিল না। কিন্তু তারা মানুষের ওপর বিনিয়োগ করেছে। তার সুফল আজ পুরো বিশ্ব দেখছে। বাংলাদেশেরও সেই পথেই হাঁটতে হবে। উন্নত দেশ গড়তে হলে প্রথমে উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থা গড়তে হবে। শ্রেণিকক্ষকে হতে হবে জ্ঞান, দক্ষতা ও মানবিক মূল্যবোধ তৈরির কেন্দ্র। শিক্ষা হতে হবে কর্মমুখী, প্রযুক্তিনির্ভর এবং গবেষণাভিত্তিক।
আজ সময় এসেছে সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়ার। শিক্ষা নিয়ে রাজনৈতিক মতভেদ নয়, জাতীয় ঐকমত্য দরকার। সরকার, শিক্ষক, অভিভাবক, শিক্ষার্থী এবং সমাজের সব অংশকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। কারণ শিক্ষার উন্নয়ন শুধু একটি মন্ত্রণালয়ের কাজ নয়। এটি পুরো জাতির দায়িত্ব। মনে রাখতে হবে, একটি দেশের ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে শ্রেণিকক্ষে। আজকের শিক্ষার্থীই আগামী দিনের বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, কৃষিবিদ, প্রকৌশলী, উদ্যোক্তা, শিক্ষক ও রাষ্ট্রনায়ক। তাদের যদি মানসম্মত শিক্ষা দেওয়া যায়, তবে বাংলাদেশও বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।
তাই এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন শিক্ষার গুণগত পরিবর্তন। শিক্ষাকে হতে হবে আধুনিক, বাস্তবমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক। কারণ একটি সত্য কখনো বদলায় না—শিক্ষার মানই জাতির মান। শিক্ষা ভালো হলে দেশ ভালো হবে। শিক্ষা এগোলে বাংলাদেশও এগিয়ে যাবে।

Leave a Reply