শিক্ষক: প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের সেতু: প্রফেসর ড. মোঃ আবু তালেব

শিক্ষক: প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের সেতু: প্রফেসর ড. মোঃ আবু তালেব

নজমুল হক গাজীপুর


পাঁচ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস। এ দিনটি শুধু শিক্ষকদের অভিনন্দন জানানোর দিন নয়। এটি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের দিন। এটি আত্মজিজ্ঞাসার দিনও। আমরা শিক্ষককে কতটা সম্মান করি? তাঁর অবদানকে কতটা মূল্য দিই? আর একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণে শিক্ষককে কতটা গুরুত্ব দিই? শিক্ষক শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করেন না। তিনি একটি প্রজন্মকে পরবর্তী প্রজন্মের সঙ্গে যুক্ত করেন। এক প্রজন্মের অর্জিত জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, মূল্যবোধ ও মানবিকতা তিনি পরবর্তী প্রজন্মের হাতে তুলে দেন। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মকে নতুন কিছু করার সাহস দেন। এ কারণেই শিক্ষককে বলা হয় মানুষ গড়ার কারিগর। পৃথিবীতে এমন কোনো শিক্ষিত মানুষ নেই, যিনি কোনো না কোনো শিক্ষকের কাছে শিক্ষা নেননি। সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, চিকিৎসক, সমাজবিজ্ঞানী, রাজনীতিবিদ, প্রশাসক, ব্যবসায়ী কিংবা উদ্যোক্তা- সবাই কোনো এক সময় শিক্ষকের ছাত্র ছিলেন। একজন রাষ্ট্রনায়কের পেছনেও কোনো শিক্ষকের শিক্ষা থাকে। একজন বিজ্ঞানীর সাফল্যের পেছনেও কোনো শিক্ষকের অনুপ্রেরণা থাকে। একজন ভালো মানুষের পেছনেও থাকে কোনো না কোনো শিক্ষকের মূল্যবোধের ছাপ। এই বাস্তবতাই শিক্ষকের গুরুত্ব বোঝার জন্য যথেষ্ট।


বিশ্ব শিক্ষক দিবসের ইতিহাসও গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৬৬ সালের ৫ অক্টোবর ইউনেসকো ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা শিক্ষকদের অধিকার, দায়িত্ব ও পেশাগত অবস্থান নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ গ্রহণ করে। সেই ঐতিহাসিক দিনকে স্মরণ করে ১৯৯৪ সাল থেকে ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে। অর্থাৎ ২০২৬ সালে এ আন্তর্জাতিক আয়োজনের ৩৩তম পালনের বছর চলছে। তবে ১৯৬৬ সালের ঐতিহাসিক সুপারিশের ৬০ বছর পূর্তি হওয়ায় এবারের বছরটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। বিশ্বের শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষক সংকট এখন বড় চ্যালেঞ্জ। ইউনেসকোর হিসাব অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে বিশ্বে প্রায় ৪ কোটি ৪০ লাখ অতিরিক্ত শিক্ষক প্রয়োজন হবে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে এই ঘাটতি বেশি। এর অর্থ স্পষ্ট। ভবিষ্যৎ পৃথিবী গড়তে শুধু বিদ্যালয়, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণ করলেই হবে না। পর্যাপ্ত যোগ্য শিক্ষকও তৈরি করতে হবে। বাংলাদেশের বাস্তবতাও আলাদা নয়। দেশে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বিপুল। প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত কোটি কোটি শিক্ষার্থী শিক্ষা গ্রহণ করছে। তাদের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে শিক্ষকের দক্ষতা, মর্যাদা ও কর্মপরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন শিক্ষক যদি শ্রেণিকক্ষে পর্যাপ্ত সময় দিতে না পারেন, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ না পান, উপযুক্ত শিক্ষা উপকরণ না পান, কিংবা পেশাগতভাবে মর্যাদাবোধ না করেন, তাহলে তার প্রভাব শিক্ষার্থীর ওপর পড়বেই। শিক্ষার মান নিয়ে আমরা প্রায়ই আলোচনা করি। কিন্তু শিক্ষার মানের সঙ্গে শিক্ষকের মানের সম্পর্ক নিয়ে তুলনামূলকভাবে কম কথা বলি। অথচ একটি সত্য অস্বীকার করার সুযোগ নেই- ভালো শিক্ষক ছাড়া ভালো শিক্ষা ব্যবস্থা সম্ভব নয়। প্রযুক্তির যুগে শিক্ষকের ভূমিকা আরও বদলে গেছে। একসময় শিক্ষকের কাছে তথ্য ছিল প্রধান সম্পদ। এখন তথ্য হাতের মুঠোয়। শিক্ষার্থী কয়েক সেকেন্ডে ইন্টারনেট থেকে হাজারো তথ্য পেতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও অনলাইন শিক্ষার প্রসার এই বাস্তবতাকে আরও বদলে দিয়েছে। তাহলে শিক্ষক কি অপ্রয়োজনীয় হয়ে যাচ্ছেন? কখনোই নয়। বরং শিক্ষকের প্রয়োজন আরও বেড়েছে। কারণ তথ্য আর জ্ঞান এক বিষয় নয়। তথ্য পাওয়া যায়। কিন্তু তথ্যকে বিশ্লেষণ করে সঠিক জ্ঞান তৈরি করতে হয়। কোনটি সত্য, কোনটি মিথ্যা, কোনটি প্রয়োজনীয়, কোনটি ক্ষতিকর- তা বুঝতে হয়। নৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হয়। মানবিক হতে হয়। অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হয়। এসব ক্ষেত্রে প্রযুক্তি শিক্ষকের বিকল্প হতে পারে না। একজন ভালো শিক্ষক শিক্ষার্থীকে শুধু উত্তর দেন না। প্রশ্ন করতে শেখান। শুধু পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার জন্য প্রস্তুত করেন না। জীবন মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত করেন। তাই শিক্ষককে কেবল একটি পেশার মানুষ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। শিক্ষক একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান। তিনি মূল্যবোধের বাহক। তিনি প্রজন্মের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করেন।


আমাদের সমাজে শিক্ষককে সম্মান করার ঐতিহ্য দীর্ঘদিনের। কিন্তু বাস্তব জীবনে সেই সম্মান কতটা আছে, সেটি নিয়ে প্রশ্ন আছে। অনেক শিক্ষক আর্থিক ও সামাজিক নানা সমস্যার মধ্যেও দায়িত্ব পালন করেন। প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষক প্রতিকূল পরিবেশে বিদ্যালয়ে যান। অনেক শিক্ষক সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও শিক্ষার্থীদের এগিয়ে নিতে চেষ্টা করেন। তাঁদের শ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন জরুরি। শিক্ষককে সম্মান মানে শুধু একটি ফুল দেওয়া নয়। শিক্ষককে সম্মান মানে তাঁর পেশাগত মর্যাদা নিশ্চিত করা। সময়মতো বেতন-ভাতা দেওয়া। প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানো। শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ উন্নত করা। প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ নিশ্চিত করা। মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশায় আকৃষ্ট করা। একই সঙ্গে শিক্ষকদেরও পেশাগত নৈতিকতা, দক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। কারণ সম্মানের সঙ্গে দায়িত্বও আসে। একজন শিক্ষক যদি নিজের দায়িত্বকে শুধু চাকরি হিসেবে দেখেন, তাহলে শিক্ষা তার কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না। শিক্ষকতা আসলে একটি মহান সামাজিক দায়িত্ব। শিক্ষকের আচরণ শিক্ষার্থীর ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। শিক্ষক সময়নিষ্ঠ হলে শিক্ষার্থী সময়নিষ্ঠ হতে শেখে। শিক্ষক সৎ হলে শিক্ষার্থী সততার মূল্য বুঝতে শেখে। শিক্ষক মানবিক হলে শিক্ষার্থীও মানবিক হওয়ার অনুপ্রেরণা পায়। এ কারণেই বলা যায়, শিক্ষক শুধু পাঠ্যবই পড়ান না। তিনি নিজের আচরণ দিয়েও শিক্ষা দেন।শিক্ষক দিবসে আমাদের আরেকটি কাজ করা দরকার। পুরোনো শিক্ষকদের খোঁজ নেওয়া। আমরা অনেকেই জীবনের ব্যস্ততায় সেই শিক্ষককে ভুলে যাই, যিনি একদিন আমাদের হাত ধরে অক্ষর চিনিয়েছেন। যিনি পরীক্ষার আগে সাহস দিয়েছেন। ব্যর্থতার পর আবার চেষ্টা করতে বলেছেন। হয়তো আজ তিনি অবসর নিয়েছেন। হয়তো বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন। হয়তো একাকী জীবন কাটাচ্ছেন। আমরা কি তাঁর খবর নিই? একটি ফোন করা যায়। দেখা করা যায়। সম্ভব হলে সঙ্গে নেওয়া যায় সামান্য ফলমূল বা মিষ্টি। দামি উপহার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন আন্তরিকতা। মা-বাবার দোয়া যেমন সন্তানের জীবনে শক্তি দেয়, তেমনি শিক্ষকের আন্তরিক দোয়াও জীবনের পথ আলোকিত করতে পারে। একজন শিক্ষকের কাছে প্রাক্তন শিক্ষার্থীর একটি ফোনও অনেক বড় আনন্দের হতে পারে। বিশ্ব শিক্ষক দিবস দিনটি তাই শুধু আনুষ্ঠানিক অভিনন্দনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকুক। সরকারের দায়িত্ব শিক্ষককে মর্যাদা দেওয়া। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব শিক্ষকদের জন্য ভালো কর্মপরিবেশ তৈরি করা। শিক্ষকদের দায়িত্ব নিজেদের জ্ঞান ও দক্ষতা নিয়মিত বাড়ানো। অভিভাবকদের দায়িত্ব শিক্ষকদের সহযোগিতা করা। আর সাবেক শিক্ষার্থীদের দায়িত্ব তাঁদের শিক্ষককে মনে রাখা। একটি জাতির উন্নয়ন শুধু বড় সেতু, উড়ালসড়ক বা শিল্পকারখানা দিয়ে মাপা যায় না। জাতির প্রকৃত শক্তি তার মানুষ। আর সেই মানুষ তৈরির প্রধান কারিগর শিক্ষক। তাই শিক্ষক দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত- শিক্ষককে সম্মান করব। শিক্ষকের মর্যাদা রক্ষা করব। শিক্ষকের পেশাগত উন্নয়নে বিনিয়োগ করব। শিক্ষাকে শুধু পরীক্ষার ফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখব না। জ্ঞান, দক্ষতা, নৈতিকতা ও মানবিকতার সমন্বয়ে মানুষ গড়ব। কারণ শিক্ষক একটি প্রজন্মকে শুধু শিক্ষা দেন না। তিনি একটি প্রজন্মকে পরবর্তী প্রজন্মের হাতে তুলে দেন। আজকের শিক্ষার্থীই আগামী দিনের শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, কৃষিবিদ, উদ্যোক্তা, প্রশাসক ও রাষ্ট্রনায়ক। আজকের শ্রেণিকক্ষেই আগামী দিনের বাংলাদেশ তৈরি হচ্ছে। তাই শিক্ষককে শক্তিশালী করা মানে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশকে শক্তিশালী করা। শিক্ষকের মর্যাদা বাড়ানো মানে জাতির মর্যাদা বাড়ানো। শিক্ষক বাঁচলে শিক্ষা বাঁচবে। শিক্ষা বাঁচলে মানুষ গড়বে। আর মানুষ গড়লে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে। বিশ্বের সব শিক্ষককে গভীর শ্রদ্ধা ও আন্তরিক অভিনন্দন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.