ভেড়ামারায় পদ্মার গ্রাসে বিলীন জনপদ: পাউবোর উদাসীনতায় দিশেহারা হাজারো কৃষক

ভেড়ামারায় পদ্মার গ্রাসে বিলীন জনপদ: পাউবোর উদাসীনতায় দিশেহারা হাজারো কৃষক

মাহমুদুল হাসান চন্দন


‎কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় প্রমত্ত পদ্মা নদীর আগ্রাসী রূপ ধারণ করায় চরম সংকটে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। উপজেলার বাহাদুরপুর ইউনিয়নের মাধবপুর, আড়কান্দি ও রায়টা অঞ্চলের নদী তীরবর্তী প্রায় ৫ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বর্তমানে তীব্র ভাঙন চলছে। গত এক বছর ধরে চলমান এই ভাঙনে ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে প্রায় ৯৫০ বিঘা ফসলি জমি।

‎প্রশাসনের সময়োচিত পদক্ষেপের অভাব ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) উদাসীনতায় একের পর এক কৃষকের স্বপ্ন পদ্মার গর্ভে তলিয়ে যাচ্ছে, যার ফলে স্থানীয় ভুক্তভোগীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।

‎পানের বরজ ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি
‎ভেড়ামারা উপজেলাটি দেশের অন্যতম প্রধান মানসম্মত পান উৎপাদনকারী অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। নদী ভাঙনের ফলে এই অঞ্চলের শত শত পানচাষির ভবিষ্যৎ এখন পুরোপুরি অনিশ্চিত। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক দিনে চাষিদের পানের বরজ, কলাবাগান নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী কুচিয়ামোড়া পান বাজার-এর ওপর, যা মূলত এই অঞ্চলের পানের সরবরাহের ওপরই টিকে রয়েছে। দুই বছর আগের ভয়াবহ আগুনে হাজার বিঘা পান বরজ পুড়ে যাওয়ার ক্ষত কাটিয়ে ওঠার আগেই নদী ভাঙনের এই নতুন দুর্যোগে চাষিরা এখন সর্বস্বান্ত।

‎বিলীন প্রাচীন শ্মশানঘাট ও ধর্মীয় আবেগ
‎নদীর তীব্র ভাঙন শুধু মানুষের জীবিকাই কেড়ে নেয়নি, আঘাত হেনেছে ধর্মীয় অনুভূতিতেও। স্থানীয় হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ব্যবহারের জন্য এই অঞ্চলে থাকা একমাত্র প্রাচীন শ্মশানঘাটটি কোনো প্রকার প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ায় সম্পূর্ণ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।

‎স্থানীয় ক্ষুদ্র কৃষক গিরি দাস ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, শ্মশানঘাটটি রক্ষার্থে পানি উন্নয়ন বোর্ড কোনো কার্যকর ভূমিকা নেয়নি। ফলে ঐতিহ্যবাহী এই শেষকৃত্যের স্থানটি যেখানে ছিল, সেখানে এখন প্রায় ৫০ ফুট গভীর পানি।

‎ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের আর্তনাদ
‎সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, দিন-রাত সমান তালে খাড়া পাড় ভেঙে নদী এগিয়ে আসছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক আমিরুল জানান, গত বছর তাঁর ভাই ও ভাতিজারা মিলে ৭-৮ বিঘা জমিতে যে পানের বরজ করেছিলেন, তা নদী গিলে খেয়েছে। একই এলাকার আজিজুল, জালাল, নাসিম, সজিব, শহীদ ও কাসেমসহ অসংখ্য প্রান্তিক চাষি তাঁদের ৫০ থেকে ১০০ পিলি বরজ হারিয়ে এখন বাকরুদ্ধ।

‎প্রশাসনের বক্তব্য ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা
‎ভাঙনের তীব্রতা নিয়ে কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাশিদুর রহমান জানান, নদী ভাঙন প্রায় দুই মাস আগে থেকেই শুরু হয়েছে এবং বর্তমান পানি বৃদ্ধির কারণে এর গতি তীব্র আকার ধারণ করেছে। তবে জরুরি ভিত্তিতে কাজ শুরুর বিষয়ে তিনি আমলাতান্ত্রিক সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে বলেন, এখানকার ভাঙন রোধে চাহিদাপত্র ও প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। তবে সেই প্রস্তাব পাশ হয়ে বাজেট না আসা পর্যন্ত আমাদের পক্ষে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব নয়।

‎অন্যদিকে, উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে ভেড়ামারা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আমিরুল আরাফাত আশ্বস্ত করে বলেন, ভাঙন রোধে দ্রুত কাজ করার জন্য আমরা পানি উন্নয়ন বোর্ডকে কঠোর তাগিদ দিয়েছি। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনা করে আমি নিজে আজই ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনে যাচ্ছি।

‎স্থানীয় জনগণের দাবি, বাজেট পাসের দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়ার অপেক্ষায় না থেকে সরকার যেন অবিলম্বে জরুরি তহবিল বরাদ্দ করে জিও ব্যাগ বা স্থায়ী বাঁধের মাধ্যমে এই ঐতিহ্যবাহী জনপদকে পদ্মার গ্রাস থেকে রক্ষা করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.