
নজমুল হক
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এই যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এবং অটোমেশনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রচলিত শিক্ষা পাঠ্যক্রম আধুনিকীকরণ ও সময়োপযোগী করার বিকল্প নেই। তাই সনদভিত্তিক শিক্ষার পরিবর্তে দেশে দক্ষতা ও প্রযুক্তিভিত্তিক ব্যবহারিক এবং কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। ৭জুন রবিবার রাজধানীর শের-ই বাংলানগরের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মলেন কেন্দ্রে আয়োজিত শিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী এ আহ্বান জানান। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজগুলোতে স্নাতক পর্যায়ে আইসিটি কোর্স পড়ানোর জন্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ১২ হাজার শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। শিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. এ এস এম আমানুল্লাহ।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর মো. লুৎফর রহমান অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন এবং গেস্ট অব অনার হিসেবে বক্তব্য রাখেন শিক্ষা সচিব আব্দুল খালেক। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা অন্তর্ভুক্তিকরণ শীর্ষক এ অনুষ্ঠানের মূল বক্তব্য ছিল- কর্মমুখী শিক্ষা নেব বিশ্বজুড়ে কাজ করবো।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেড় দশকের বেশি সময় ধরে চলা ফ্যাসিবাদী শাসন ও শোষণ শুধু দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেয়নি, শিক্ষা ব্যবস্থাকেও বিপর্যস্ত করেছে। তবে বর্তমান গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে এখন ঘুরে দাঁড়ানোর সময়। তিনি বলেন, প্রযুক্তিগত বিপ্লবের সাথে তাল মেলাতে শিক্ষা পাঠ্যক্রমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, প্রোগ্রামিং, ডিজিটাল উদ্যোক্তা, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, ন্যানোপ্রযুক্তি এবং ফাইভ-জি প্রযুক্তির মত বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি হয়ে পড়েছে। এজন্য সরকার প্রাথমিক থেকে সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত শিক্ষাক্রমকে বাস্তবসম্মত ও প্রযুক্তিভিত্তিক করার কাজ শুরু করেছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষিত বেকারত্বের হার কমাতে সরকার শিক্ষানবিশ, ইন্টার্নশিপ এবং শিল্প-সহযোগিতা বাড়ানোর কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। একইসাথে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকেই তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে উঠতে সহায়তার জন্য ”সিড ফান্ডিং” বা ”ইনোভেশন গ্র্যান্ট” প্রদানের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইংরেজির পাশাপাশি তৃতীয় একটি ভাষা শিখলে তরুণদের চাকরির অভাব হবে না। সরকারের উদ্যোগ বাস্তবায়নে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দক্ষতা ও কর্মমুখী শিক্ষার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা, মানসিক স্বাস্থ্য, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়ে আরো বেশি সচেতন করতে হবে। জাতীয় উন্নয়নকে একটি সম্মিলিত যাত্রা হিসেবে আখ্যা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী একটি জ্ঞান ও মেধাভিত্তিক সমাজ গঠনে বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, সুশীল সমাজ এবং শিল্প খাতসহ সকলের সহযোগিতা কামনা করেন।
অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, বর্তমান প্রতিযোগিতার বাজারে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় সিলেবাস সংস্কারসহ যুগোপযোগী কর্মমুখী শিক্ষা নিশ্চিতে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। যা বর্তমান সরকারের শিক্ষাভাবনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন জানান, দেশের প্রান্তিক পর্যায় থেকে শুরু করে সকল শ্রেণি-পেশার জনগোষ্ঠীর মধ্যে উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। যার ফলশ্রুতিতে বর্তমানে লাখ লাখ শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে নিজেদের জীবনমান উন্নয়ন এবং জাতীয় অর্থনীতি ও রাষ্ট্রগঠনে সক্রিয় অবদান রাখছে। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. এ এস এম আমানুল্লাহ জানান, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৪০ লাখ শিক্ষার্থীর কর্মসংস্থান নিশ্চিতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও দক্ষতাভিত্তিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করার জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। যা বর্তমান সরকারের যুব উন্নয়ন, দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রযুক্তি বিস্তার এবং উচ্চশিক্ষা সংস্কারবিষয়ক অগ্রাধিকার বাস্তবায়নে সহায়ক হবে। তিনি জানান, চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং বৈশ্বিক কর্মবাজারের পরিবর্তিত চাহিদার প্রেক্ষাপটে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতক পর্যায়ে আইসিটি কোর্স বাধ্যতামূলক করেছে। সরকারের এটুআই প্রকল্প ও ইউনিসেফের জেনারেশন আনলিমিটেড-এর সহায়তায় আইসিটি কোর্সের পাঠ্যক্রম প্রণয়নের পর তা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এছাড়া শিক্ষার্থীদের তৃতীয় ভাষা শেখার সুযোগ করে দিতে মাল্টি ল্যাংগুয়েজ লার্নিং ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা এবং সরকারের সবুজায়ন কর্মসূচির অংশ হিসেবে আগামী ৫ বছরে দুই কোটি গাছ লাগানোর কর্মসূচি- “ওয়ান স্টুডেন্ট, ওয়ান ট্রি” প্রকল্প গ্রহণ করেছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।তিনি আশা প্রকাশ করেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের এসব সংস্কার কর্মসূচি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হলে খুব শিগগিরই বাংলাদেশের চেহারা পাল্টে যাবে। জাতীয় সঙ্গীতের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরুর পর মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং জুলাই আন্দোলনের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নিরবতা পালন করা হয়। এরপর অনুষ্ঠানে ”লিবারেশন টু লিডারশিপ” শীর্ষক তথ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। এই তথ্যচিত্রে শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দেশ ও জনগণ নিয়ে বিভিন্ন ভাবনা তুলে ধরা হয়। দেশের ক্রান্তিলগ্নে শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বিভিন্ন অবদানের কথাও এই তথ্যচিত্রে উঠে আসে। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ক্রেস্ট ও গাছের চারা উপহার দেয়া হয়। এই শিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিএনপি মহাসচিব ও এলজিআরডি মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, মন্ত্রী পরিষদের সদস্য, সংসদ সদস্য, সচিব, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, বিদেশী কূটনীতিক, ইউনিসেফের প্রতিনিধি, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সম্পাদকবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার প্রফেসর ড. এ টি এম জাফরুল আযম, রেজিস্ট্রার মোল্লা মাহফুজ আল-হোসেন, শিক্ষক ও কর্মকর্তা, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজের অধ্যক্ষ, শিক্ষক ও ছাত্র-ছাত্রীরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে ভাচুর্য়ালি যুক্ত হয় দেশজুড়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত এক হাজার কলেজ ও প্রায় ছয় লাখ শিক্ষার্থী।

Leave a Reply