টরন্টো, কানাডা – উত্তর আমেরিকার রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে এবার উজ্জ্বল এক নাম ডলি বেগম। প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নারী হিসেবে কানাডার কোনো নির্বাচনে জয়ী হয়ে ইতিহাস গড়েছেন তিনি। ডলি বেগমের এই পথচলা কেবল তার ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং এটি বিশ্বমঞ্চে প্রবাসীদের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ও বাংলাদেশি কমিউনিটির এক অনন্য মাইলফলক।
ডলি বেগমের রাজনৈতিক ইতিহাসের সূচনা হয় ৭ জুন, ২০১৮ তারিখে। ওই দিন অনুষ্ঠিত ওন্টারিও প্রাদেশিক নির্বাচনে টরন্টো-স্কেয়ারবরো সাউথওয়েস্ট আসন থেকে নিউ ডেমোক্রেটিক পার্টির (এনডিপি) প্রার্থী হিসেবে প্রথমবার লড়াই করেন তিনি। সেই নির্বাচনে ক্ষমতাসীন লিবারেল পার্টির হেভিওয়েট প্রার্থী লরেঞ্জো বেরারডিনেত্তিকে প্রায় ৬ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত হিসেবে কানাডার কোনো আইনসভার সদস্য (এমপিপি) নির্বাচিত হন।
সে সময় মাত্র ২৯ বছর বয়সে এই জয় তাকে কানাডার রাজনীতিতে কনিষ্ঠ ও প্রভাবশালী নেতাদের কাতারে নিয়ে আসে। পরবর্তীকালে ২০২২ সালের নির্বাচনেও তিনি বিপুল জনসমর্থন নিয়ে পুনরায় বিজয়ী হন।
প্রাদেশিক পার্লামেন্টে সাফল্যের পর ডলি বেগম সম্প্রতি ফেডারেল বা জাতীয় রাজনীতিতে পদার্পণ করেছেন। ১৩ এপ্রিল, ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত ফেডারেল উপ-নির্বাচনে তিনি লিবারেল পার্টির প্রার্থী হিসেবে স্কেয়ারবরো সাউথওয়েস্ট আসন থেকেই লড়াই করেন। এই নির্বাচনে তিনি বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়ে এখন সরাসরি কানাডার হাউস অব কমন্সের সংসদ সদস্য (এমপি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
বিজয় ঘোষণার পর ডলি বেগম তার সমর্থকদের উদ্দেশে বলেন, “এই জয় আমাদের সবার। আপনারা প্রমাণ করেছেন যে, কঠোর পরিশ্রম এবং সঠিক লক্ষ্য থাকলে প্রবাসে থেকেও নিজ শিকড়কে সম্মান জানিয়ে সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছানো সম্ভব।”
ডলি বেগমের জীবনসংগ্রাম
ডলি বেগমের জন্ম বাংলাদেশের মৌলভীবাজার জেলার মনু নদীর তীরবর্তী এক সাধারণ পরিবারে। শিশু বয়সেই পরিবারের সাথে পাড়ি জমান স্বপ্নের দেশ কানাডায়। তবে অভিবাসী হিসেবে নতুন দেশে মানিয়ে নেওয়া এবং নিজের অবস্থান তৈরি করার পথটি মোটেও মসৃণ ছিল না।
কানাডায় পৌঁছানোর পর ডলি বেগমের পরিবারকে নানা প্রতিকূলতার মোকাবিলা করতে হয়েছে। তার বাবা গুরুতর এক সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার পর পুরো পরিবারের দায়িত্ব এসে পড়ে ডলির ওপর। একদিকে পড়াশোনা, অন্যদিকে সংসারের হাল ধরা—এই দুইয়ের মাঝে লড়াই করতে করতেই তার নেতৃত্বের গুণাবলী বিকশিত হয়। টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাজনীতি বিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষা লাভ করা ডলি বেগম ছাত্রজীবন থেকেই স্থানীয় সামাজিক ও অধিকার রক্ষা আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন।
কানাডার পার্লামেন্ট বা প্রাদেশিক পরিষদে এর আগে দক্ষিণ এশীয় অনেক প্রতিনিধি থাকলেও বাংলাদেশিদের কোনো প্রতিনিধিত্ব ছিল না। ২০১৮ সালে ডলি বেগমের মাধ্যমেই সেই শূন্যতা পূরণ হয়। তার বিজয়ের পেছনে কাজ করেছে বেশ কিছু বিশেষ কারণ:
- দীর্ঘদিনের জনসেবা: ডলি বেগম কেবল নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনীতি করেননি। তিনি বছরের পর বছর স্কেয়ারবরো এলাকার মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন, বিশেষ করে সাশ্রয়ী আবাসন ও অভিবাসীদের কর্মসংস্থান নিয়ে কাজ করেছেন।
- কমিউনিটি সংযোগ: টরন্টোর ড্যানফোর্থ ও স্কেয়ারবরো এলাকায় বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি ও অন্যান্য অভিবাসীদের বাস। ডলি বেগম তাদের আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছেন।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
এমপি হিসেবে শপথ নেওয়ার পর ডলি বেগমের কাঁধে এখন জাতীয় পর্যায়ের বিশাল দায়িত্ব। তিনি তার নির্বাচনী প্রচারণার সময় কিছু সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যা বাস্তবায়নে তিনি বদ্ধপরিকর। তার প্রধান লক্ষ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- সাশ্রয়ী আবাসন: টরন্টোর ক্রমবর্ধমান আবাসন সমস্যা সমাধানে কার্যকরী ভূমিকা রাখা।
- অভিবাসী অধিকার: নতুন আসা অভিবাসীদের বিদেশি ডিগ্রির স্বীকৃতি ও কর্মসংস্থান সহজতর করা।
- স্বাস্থ্যসেবা: সবার জন্য উন্নত ও সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা।
ডলি বেগমের এই ধারাবাহিক সাফল্যে খোদ বাংলাদেশেও বইছে আনন্দের বন্যা। বিশেষ করে তার জন্মস্থান মৌলভীবাজারে মিষ্টি বিতরণ ও আনন্দ মিছিল হয়েছে। প্রবাসীদের এমন সাফল্য বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ডলি বেগম প্রমাণ করেছেন যে, গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হলো বৈচিত্র্য। একজন সাধারণ অভিবাসী মেয়ে থেকে কানাডার জাতীয় সংসদের সদস্য হওয়া পর্যন্ত তার এই যাত্রা আগামী প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। ডলি বেগমের হাত ধরে কানাডা ও বাংলাদেশের সম্পর্কের এক নতুন অধ্যায় সূচিত হবে—এমনটাই প্রত্যাশা সবার।

Leave a Reply