সৌদি আরবে আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান, এক সপ্তাহে গ্রেপ্তার ১১ হাজারের বেশি প্রবাসী

সৌদি আরবে আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান, এক সপ্তাহে গ্রেপ্তার ১১ হাজারের বেশি প্রবাসী

সৌদি আরব প্রতিনিধি মোঃ রাকিব হোসেন

সৌদি আরবে আবাসন, শ্রম ও সীমান্ত নিরাপত্তা আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে দেশজুড়ে ব্যাপক অভিযান পরিচালনা করেছে দেশটির আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। চলমান এই বিশেষ অভিযানে গত এক সপ্তাহেই ১১ হাজার ৩০০ জনের বেশি প্রবাসীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। দেশটির বিভিন্ন শহর ও অঞ্চলে একযোগে পরিচালিত এই অভিযানে অবৈধভাবে অবস্থানরত, অনুমোদনহীনভাবে কর্মরত এবং সীমান্ত নিরাপত্তা আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে আবাসন আইন লঙ্ঘনের দায়ে ৭ হাজার ৪০০ জন, সীমান্ত নিরাপত্তা আইন লঙ্ঘনের দায়ে ২ হাজার ৫০০ জন এবং শ্রম আইন ভঙ্গের অভিযোগে আরও ১ হাজার ৪০০ জন আটক হয়েছেন। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বৈধ কাগজপত্র ছাড়া বসবাস, অনুমোদনহীন প্রতিষ্ঠানে কাজ করা, ভিসার শর্ত লঙ্ঘন এবং সীমান্তপথে অবৈধ অনুপ্রবেশের মতো অপরাধে জড়িতদের শনাক্ত করে এই অভিযান চালানো হচ্ছে।

এদিকে, আটক হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে বর্তমানে ২৯ হাজার ৯১৩ জনের বিরুদ্ধে আইনি কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এর মধ্যে ২৫ হাজার ৭৭১ জন পুরুষ এবং ৪ হাজার ১৪২ জন নারী রয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই, আইনগত প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনার কাজ চলছে। সৌদি প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর যারা দেশে ফেরত পাঠানোর উপযুক্ত বিবেচিত হবেন, তাদের দ্রুত নিজ নিজ দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।

সরকারি তথ্যে আরও জানা গেছে, গত এক সপ্তাহেই ১৪ হাজার ৮৫৫ জন প্রবাসীকে নিজ নিজ দেশে ফেরত (ডিপোর্ট) পাঠানো হয়েছে। এদের মধ্যে অনেকে দীর্ঘদিন ধরে বৈধ কাগজপত্র ছাড়া সৌদিতে অবস্থান করছিলেন, আবার কেউ কেউ নির্ধারিত কর্মস্থল পরিবর্তন করে অবৈধভাবে অন্যত্র কাজ করছিলেন। সৌদি সরকারের কঠোর নজরদারি ও নিয়মিত অভিযানের কারণে এখন এসব অনিয়ম দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

সৌদি সরকার এ বিষয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে জানিয়েছে, যারা অবৈধভাবে কাউকে সৌদি আরবে প্রবেশে সহায়তা করবে, সীমান্ত পারাপারে সহযোগিতা করবে, আশ্রয় দেবে অথবা আইন লঙ্ঘনকারীদের কাজের সুযোগ করে দেবে—তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এসব অপরাধে সর্বোচ্চ ১৫ বছরের কারাদণ্ড, ১০ লাখ সৌদি রিয়াল পর্যন্ত জরিমানা, এবং অপরাধে ব্যবহৃত যানবাহন, বাড়ি বা অন্যান্য সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার বিধান রয়েছে। ফলে শুধুমাত্র আইন ভঙ্গকারীরাই নয়, বরং তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধেও কঠোর অবস্থানে রয়েছে প্রশাসন।

বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরব বর্তমানে তাদের শ্রমবাজার, আবাসন ব্যবস্থাপনা এবং সীমান্ত নিরাপত্তাকে আরও শক্তিশালী করতে ধারাবাহিকভাবে কঠোর নীতি বাস্তবায়ন করছে। বিশেষ করে বিদেশি কর্মীদের জন্য ইকামা নবায়ন, কাজের অনুমতি, নিয়োগকর্তা পরিবর্তনের নিয়ম এবং ভিসার শর্ত কঠোরভাবে তদারকি করা হচ্ছে। এর ফলে যেসব প্রবাসী বৈধ কাগজপত্র হালনাগাদ করেননি বা নিয়মের বাইরে গিয়ে কাজ করছেন, তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বৈধ কাগজপত্র ছাড়া অবস্থানরত প্রবাসীদের দ্রুত নিজেদের ইকামা, শ্রম অনুমতি, ভিসা ও অন্যান্য নথিপত্র হালনাগাদ করার আহ্বান জানিয়েছে। পাশাপাশি নিয়োগকর্তাদেরও কর্মীদের নথিপত্র নিয়মিত রাখার বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। অন্যথায় গ্রেপ্তার, জরিমানা কিংবা দেশে ফেরত পাঠানোর মতো কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হতে হতে পারে সংশ্লিষ্টরা।

সৌদি আরবে অবস্থানরত বাংলাদেশিসহ অন্যান্য প্রবাসীদের জন্য এই পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন অভিবাসন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, বৈধ কাগজপত্র ছাড়া অবস্থান বা নিয়মবহির্ভূত কাজ ভবিষ্যতে শুধু আইনি জটিলতাই নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি নিষেধাজ্ঞার কারণও হতে পারে। তাই আইন মেনে চলা এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সময়মতো নবায়ন করাই নিরাপদ থাকার একমাত্র পথ।

তথ্যসূত্র: সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (Ministry of Interior) ও সৌদি প্রেস এজেন্সি (SPA)।

Leave a Reply

Your email address will not be published.