
কাজল মালেক
২৪তম পর্ব
শাহনালী রাজসাক্ষী হয়েছে। অকপটে স্বীকার করেছে তার অপকর্ম ও তারসঙ্গে জড়িত হোমরাচোমরাদের নাম। তার জবানবন্দী সাধারণ মানুষের কাছে তো বটেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিকটও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। পুলিশের কাছে শাহনের ভাষ্য অনুযায়ী, “এলাকার চুরি ডাকাতির গ্যাং লীডার হচ্ছে পূর্ব গাজীপুরের জুমন আলী প্রধান। তার সঙ্গে আছে আর যেসকল নেতৃস্থানীয় ডাকুসন্ত্রাসীরা তারা হচ্ছে একই গ্রামের আলীমুদ্দীন, আশ্রবালী ( আলীমুদ্দীর বড় ছেলে), ইমামুদ্দীন, সৈয়দালী,আদম মিয়া ও নসু শেখ। এই চক্রের নির্দেশনায় দীর্ঘদিন থেকে তাদের সাঙ্গপাঙ্গরা পার্শ্ববর্তী এলাকায় চুরিডাকাতি করে আসছে। শাহনও এই দলের একজন কনিষ্ঠ সদস্য। মাসদুই আগে ভালুকার সিডস্টোর বাজারের বড় ব্যবসায়ী সৈয়দবাড়িতে ডাকাতি করতে গিয়েছিলো জুমন প্রধানের দল। তারা স্থানীয় জনতার প্রতিরোধের মুখে পড়ে এবং উপায়ান্তর না দেখে পালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। পাশের গভীর বনের মধ্য দিয়ে বন্দুকসহ পালানোর সময় দলের দুজন ডাকাত ধরা পড়ে। অবশ্য ধরা পড়ার আগেই তারা অন্ধকারে বনের ভেতরে একটা গর্তের মতো জায়গায় বন্দুকটি ফেলে দেয়। দুদিন পর শাহন গোপনে খোঁজাখুঁজি করে সিডস্টোরের জঙ্গল থেকে বন্দুকটি উদ্ধার করে নিয়ে আসে।
উল্লেখ্য সেইদিন এই বন্দুকের গুলিতে
বাড়ির মালিক ধলা মড়ল আহত হয়েছিলো। ধৃত তোতা মিয়া ও হাফিুজুদ্দী এখন জেলে আছে। তাদের জবানবন্দী অনুযায়ী এই ঘটনার সত্যতা মিলেছে।” এদিকে এরিমধ্যে আক্কু ডাকাতের বিশ্বস্থ দুজন লোক জেলখানার গেইটে তোতা মিয়া আর হাফিজুদ্দীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। তাদের বলে, ‘সিডস্টোরের ডাকাতির ঘটনায় জুমন প্রধানকে জড়িত করে তার বন্দুক দিয়েই গুলি করা হয়েছিলো এই কথা পুলিশকে বলতে হবে। অনেক টাকার মালিক সে। তাকে জড়িত করতে পারলে তার টাকা দিয়ে সবাইকে খালাস করিয়ে নেবে। এটা আক্কুর আদেশ।’ শাহনের জবানবন্দীর পর এ বিষয়ে তোতা মিয়া ও হাফিজুদ্দীর কাছে জিজ্ঞেস করলে আল্লাহ হাজির নাজির জেনে শপথ করে শেখানো কথাগুলোই পুলিশকে জানায়।
শাহন রাজসাক্ষীর জবানবন্দীতে আরও উল্লেখ করে, ডাকাতদের প্রধান যদি মনে করে দলের কোন সাধারণ সদস্য তাদের গোপন তথ্য ও পরবর্তী পরিকল্পনা জেনে ফেলেছে এবং তার ধরা পড়ার আশঙ্কা আছে তাহলে সেই সদস্যকে আর বাঁচিয়ে রাখেনা। কোন এক ছুতায় তাকে মেরে ফেলে। বন্দুক উদ্ধার করে ফিরে আসার পর তার দলের একজন শাহনকে অবহিত করে যে, এই বন্দুক জুমনের হাতে ফিরিয়ে দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাকে হত্যা করা হবে। কারণ সে দলের অনেক গোপন জেনে গিয়েছে। এই কথা শোনার পর শাহন জুমনের ভয়ে বন্দুক নিয়ে এলাকা ছেড়ে পালায়। নিজের বন্দুক না পেয়ে এতে বিপদ হতে পারে ভেবে শাহনের প্রতি রুষ্ট জুমন তার সাঙ্গপাঙ্গের সঙ্গে পরামর্শ করে এই অভিনব ঘটনা সাজায়। অতঃপর চুরির কেইস করে।
ছোট প্রধানবাড়িতে চুরি হওয়ার আগের সন্ধ্যায় ওই বাড়িতে শাহন গিয়েছিলো বলে জিডিতে উল্লেখ আছে। এর জবাবে শাহন জানায়, সেদিন ওখানে যাওয়ার প্রশ্নই আসেনা। এগুলো সাজানো নাটকের অংশ। সে তো এইসময় জীবন বাঁচানোর জন্য জুমনের ভয়ে পালিয়ে বেড়াতো। তার হাজতে যাওয়ার খবর পেয়ে শাহন বাড়ি ফিরেছে।
থানায় রাজসাক্ষী শাহনালীর জবানবন্দীতে দেয়া এইসব অভিযোগ জুমন আলী প্রধানকে শোনানো হয়। বিষ্ময়ে হতবাক ও হতবিহ্বল হয়ে পড়ে সে। নিজেকে নিরুপায় মনে করে জুমন। ওরা আত্মীয় হয়ে এমন ষড়যন্ত্র করে এতো বড়ো ফাঁদ পাততে পারে একথা কল্পনাতেও আসেনি তার। থানায় জিজ্ঞাসাবাদের পর জুমন আলী প্রধানসহ আর সব ধৃত অভিযুক্তকে কোর্টে চালান দেয়া হলো।
নিঃসীম স্তব্ধতা। বৈরী প্রকৃতির ক্রুরতার অভিসম্ভাবী বহিঃপ্রকাশ। ঝড় আসতে পারে। ঝড় বয়ে যাচ্ছে তহরজানের মনের ভেতরে। বড়ো আশঙ্কার আঁধার ঘনিয়ে রাত নেমেছে। আকাশে জমেছে কালো মেঘ। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। তারচেয়েও বেশি অন্ধকার তহরজানের ঘরে এসে জমাট বেধেছে। বাড়ির মালিক বিনা দোষে হাজতবাস করছে। সন্তানদের মধ্যে একমাত্র হাসেম ছাড়া আর সবাই অবুঝ। কাশেম একরোখা, একগুঁয়ে। যা ভালো মনে করে তাই করে বসে। মোমতাজ মাষ্টার এ বাড়ির গৃহশিক্ষক হয়েও যতটা সম্ভব করে যাচ্ছেন। তিনি সম্মানী লোক, গাজীপুর হাইস্কুলের শিক্ষক। তাকে এলাকায় সকলেই সমীহ করে। থানার বড় দারোগা মানে ওসির সাথে ভালো জানাশোনা। প্রধান সাহেব যে নির্দোষ এবং তিনি এক গভীর ষড়যন্ত্রের শিকার এই কথা ওসি সাহেবকে বোঝাতে পেরেছেন তিনি। তবে আইন চলে নির্দেশিত নিজস্ব পথে,নির্দিষ্ট গতিতে। তথ্য, উপাত্ত ও যুক্তিতর্কের ভিত্তিতে এখানে সত্যমিথ্যার যাচাই হয়।
বাড়িতে খালেক, মালেক,বারেক, রশীদের হৈচৈয়ে অস্থির তহরজান, সর্বক্ষণ ওদের দুরন্তপনার রাজত্ব চলছে। মারামারি, কান্নাকাটি, অভিযোগ আবার একত্রে বসে খেলাধূলা, হাসাহাসি এতোসবে অতিষ্ঠ তহরজান। এতবড় সর্বনাশ ঘটে গেছে, পুলিশ এসে তাদের বাবাকে ধরে নিয়ে গেছে, এসব যেন কিছুই না ওদের কাছে। সরজান খাতুনের ঘরে আবার সন্তান এসেছে। তার নাম রেখেছে মনোয়ারা। রশীদের সমান বয়সী। খাতুনের পক্ষেও ছোট বাচ্চা নিয়ে এবাড়িতে বেশিক্ষণ সময় দেয়া সম্ভব হয়না। কাদিগড় থেকে তার শাশুড়ী নগরিবিবি এসেছিলেন। দু’দিন থেকে তহরজানের দুর্দশা দেখে লালজানকে পাঠিয়ে দিলেন। তার ছোটমেয়ে আনোয়ারাকে সঙ্গে নিয়ে এসেছিলো সে। লালজান আবার সন্তান সম্ভবা। তার ৫ম সন্তান আসছে। নিজেই অসুস্থ। হাটতে চলতেই পারেনা। তহরজানের দুঃসময়ে কাছে থাকতে চেয়েছিলো। এখন নিজেই বমি করে অসুখ বাঁধিয়ে বসেছে। তার বিপদ দেখে হাসেম মহিষের গাড়িতে করে তাকে তাদের বাড়িতে গিয়ে দিয়ে এলো। গৃহস্থালি দেখাশোনা করে দুই বিশ্বস্থ কামলা শুক্কুরালী আর আমীরালী। তহরজানের ছোট জা জয়গুন প্রায়দিন তাকে সান্ত্বনা দিতে আসে। সাথে করে নিয়ে আসে ফলমুল, এটাসেটা। সিঙ্গারদিঘী যাওয়া আসার পথে রহিমাও তার সঙ্গে খানিকক্ষণ সময় কাটিয়ে যায়। বড় ভাশুর অলি প্রধানের মেয়ে সমবয়সী রহিমার সাথে তার সখ্যতা বড় প্রধানবাড়িতে বউ হয়ে যাবার পর থেকে। রহিমার বিয়ের পর থেকে তারা একত্রে হলেই দু’জন দুজনের মনের কথা বিনিময় করে। সিঙ্গারদিঘীর ধনাঢ্য গৃহস্থ রমজান মাদবরের ছেলে কলিমউদ্দিনের সঙ্গে বিয়ে হয়েছে তার। রহিমার বড় ছেলে মোবারক হোসেন, কাশেমের চেয়ে সামান্য বড়, তারপর ফিরোজা, আরও দুই ছেলে সিরাজ ও আলী আকবর। মহিষের গাড়ি করে রহিমা প্রায়ই তার ছোট ছেলে আলী আকবর ও মেয়ে ফিরোজাকে সঙ্গে নিয়ে এই পথে বড় প্রধানবাড়ি (বাবার বাড়ি) যাতায়াত করে। বড় ছেলে মোবারক হোসেন অধিকাংশ সময় নানাবাড়িতে কাটায়। গফুর প্রধানের জ্যেষ্ঠ সন্তান ইসমাইলের সঙ্গে স্কুলে যায়। দুই মামা ভাগ্নের মধ্যে সম্পর্ক বন্ধুর মতো। আজ সকালে গফুর প্রধান এসে তরতরকারি কিনে দিয়ে গেছে। বড়ভাই অলি প্রধান নেয়ামত সরকারকে সঙ্গে নিয়ে জেলগেটে গিয়ে জুমনের সঙ্গে দেখা করে এসেছেন। তহরজানকে সে খবর জানিয়ে গেছেন অলি প্রধান। জুমন শক্তমনের মানুষ। সে বিশ্বাস করে সত্য প্রকাশিত হবে এবং বিপদ কেটে যাবে। নিয়ামত এসে খালেক আর মালেককে কাদিগড় নিয়ে গেলো। বললো,”রেজাক আর বারুর সাথে মিললা খেলবে। কয়দিন থাহুক আমার এহানে।” রেজাক মানে রাজ্জাক আর বাররু হলো বারেক। এই নামগুলোর সাথে এই দেশের প্রায় পরিবারেই কারো না কারোর নামের সঙ্গে মিলে যায়। মুসলিম সমাজে সন্তানের নাম আল্লাহর নামে রাখার রেওয়াজ আছে। অবশ্য এই নামগুলো উচ্চারণের আগে আবদুল বলতে হয়। সরাসরি আল্লাহর নামে কাউকে ডাকা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিধিসম্মত নয়। আবদুল আরবী শব্দ যার অর্থ বান্দা বা দাস। আবদুর রাজ্জাক, মানে রিজিক দাতার( রাজ্জাক) দাস,তেমনি আবদুল খালেক মানে সৃষ্টিকর্তার( খালেক) দাস। প্রতি মুসলিমের ঘরে এগুলো খুব প্রচলিত নাম।
মায়ের পাশে শুয়ে আছে তিন সন্তান। পাশাপাশি শুয়েছে পাঁচ বছর বয়সের বারেক, তার ছোট রশীদ ও ছয়মাসের শিশু বকুল। বারেকের গায়ে জ্বর,খুক খুক কাশে। তার গায়ে কাঁথা জড়িয়ে দেয় তহরজান। বারেক কাঁথা সরিয়ে পা দিয়ে ঠেলে আর বলে, “বড় খেতা কা?” জ্বরের ঘোরে শীতে কাঁপছে তবু গায়ে কাঁথা জড়াবে না। সে ঘুমিয়ে গেলে আবার তার গায়ে কাঁথা তুলে দেয় তহরজান। পাশে রশীদ নির্বিঘ্নে ঘুমোচ্ছে। সেও মায়ের দুধ খেতে চায়। জেগে উঠেই বকুলের মুখ সরিয়ে সে নিজে মায়ের বুকে মুখ রাখে। বকুল কান্না জুড়ে দেয়। রশীদের পিঠে একটা থাপ্পড় দিয়ে তাকে সরিয়ে দেয় তহরজান। বলে,” মুদ্দুইডা আমার মাইয়াডারে খাইতে দেয়না। যা এইহানথে-“। মায়ের বুকে মুখ ডুবিয়ে চুক চুক করে দুধ খায় বকুল। দুধ ভরা মায়ের স্তন মুখে টানতে টানতে আবার কখন ঘুমিয়ে পড়ে শিশুটি। ঘুম আসেনা তহরজানের চোখে। প্রায় রাত তার বিনিদ্র কাটে। ঘরের ভেতর অন্ধকারের মধ্যে তিন সন্তানের গায়ে হাত রেখে আদর করে সে। বাইরে বৃষ্টির ছোপ ছোপ বৃষ্টির শব্দ শুনে। টিনের চালে পড়ে বৃষ্টির সেই শব্দ অদ্ভুত সুরধ্বনির সৃষ্টি করে। বৃষ্টি নামে তহরজানের চোখে। অবিরল ধারার সেই বৃষ্টি আর থামেনা।
বসুন্ধরা, ঢাকা
১৪তিনকাল
কাজল মালেক
২৪তম পর্ব
শাহনালী রাজসাক্ষী হয়েছে। অকপটে স্বীকার করেছে তার অপকর্ম ও তারসঙ্গে জড়িত হোমরাচোমরাদের নাম। তার জবানবন্দী সাধারণ মানুষের কাছে তো বটেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিকটও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। পুলিশের কাছে শাহনের ভাষ্য অনুযায়ী, “এলাকার চুরি ডাকাতির গ্যাং লীডার হচ্ছে পূর্ব গাজীপুরের জুমন আলী প্রধান। তার সঙ্গে আছে আর যেসকল নেতৃস্থানীয় ডাকুসন্ত্রাসীরা তারা হচ্ছে একই গ্রামের আলীমুদ্দীন, আশ্রবালী ( আলীমুদ্দীর বড় ছেলে), ইমামুদ্দীন, সৈয়দালী,আদম মিয়া ও নসু শেখ। এই চক্রের নির্দেশনায় দীর্ঘদিন থেকে তাদের সাঙ্গপাঙ্গরা পার্শ্ববর্তী এলাকায় চুরিডাকাতি করে আসছে। শাহনও এই দলের একজন কনিষ্ঠ সদস্য। মাসদুই আগে ভালুকার সিডস্টোর বাজারের বড় ব্যবসায়ী সৈয়দবাড়িতে ডাকাতি করতে গিয়েছিলো জুমন প্রধানের দল। তারা স্থানীয় জনতার প্রতিরোধের মুখে পড়ে এবং উপায়ান্তর না দেখে পালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। পাশের গভীর বনের মধ্য দিয়ে বন্দুকসহ পালানোর সময় দলের দুজন ডাকাত ধরা পড়ে। অবশ্য ধরা পড়ার আগেই তারা অন্ধকারে বনের ভেতরে একটা গর্তের মতো জায়গায় বন্দুকটি ফেলে দেয়। দুদিন পর শাহন গোপনে খোঁজাখুঁজি করে সিডস্টোরের জঙ্গল থেকে বন্দুকটি উদ্ধার করে নিয়ে আসে।
উল্লেখ্য সেইদিন এই বন্দুকের গুলিতে
বাড়ির মালিক ধলা মড়ল আহত হয়েছিলো। ধৃত তোতা মিয়া ও হাফিুজুদ্দী এখন জেলে আছে। তাদের জবানবন্দী অনুযায়ী এই ঘটনার সত্যতা মিলেছে।” এদিকে এরিমধ্যে আক্কু ডাকাতের বিশ্বস্থ দুজন লোক জেলখানার গেইটে তোতা মিয়া আর হাফিজুদ্দীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। তাদের বলে, ‘সিডস্টোরের ডাকাতির ঘটনায় জুমন প্রধানকে জড়িত করে তার বন্দুক দিয়েই গুলি করা হয়েছিলো এই কথা পুলিশকে বলতে হবে। অনেক টাকার মালিক সে। তাকে জড়িত করতে পারলে তার টাকা দিয়ে সবাইকে খালাস করিয়ে নেবে। এটা আক্কুর আদেশ।’ শাহনের জবানবন্দীর পর এ বিষয়ে তোতা মিয়া ও হাফিজুদ্দীর কাছে জিজ্ঞেস করলে আল্লাহ হাজির নাজির জেনে শপথ করে শেখানো কথাগুলোই পুলিশকে জানায়।
শাহন রাজসাক্ষীর জবানবন্দীতে আরও উল্লেখ করে, ডাকাতদের প্রধান যদি মনে করে দলের কোন সাধারণ সদস্য তাদের গোপন তথ্য ও পরবর্তী পরিকল্পনা জেনে ফেলেছে এবং তার ধরা পড়ার আশঙ্কা আছে তাহলে সেই সদস্যকে আর বাঁচিয়ে রাখেনা। কোন এক ছুতায় তাকে মেরে ফেলে। বন্দুক উদ্ধার করে ফিরে আসার পর তার দলের একজন শাহনকে অবহিত করে যে, এই বন্দুক জুমনের হাতে ফিরিয়ে দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাকে হত্যা করা হবে। কারণ সে দলের অনেক গোপন জেনে গিয়েছে। এই কথা শোনার পর শাহন জুমনের ভয়ে বন্দুক নিয়ে এলাকা ছেড়ে পালায়। নিজের বন্দুক না পেয়ে এতে বিপদ হতে পারে ভেবে শাহনের প্রতি রুষ্ট জুমন তার সাঙ্গপাঙ্গের সঙ্গে পরামর্শ করে এই অভিনব ঘটনা সাজায়। অতঃপর চুরির কেইস করে।
ছোট প্রধানবাড়িতে চুরি হওয়ার আগের সন্ধ্যায় ওই বাড়িতে শাহন গিয়েছিলো বলে জিডিতে উল্লেখ আছে। এর জবাবে শাহন জানায়, সেদিন ওখানে যাওয়ার প্রশ্নই আসেনা। এগুলো সাজানো নাটকের অংশ। সে তো এইসময় জীবন বাঁচানোর জন্য জুমনের ভয়ে পালিয়ে বেড়াতো। তার হাজতে যাওয়ার খবর পেয়ে শাহন বাড়ি ফিরেছে।
থানায় রাজসাক্ষী শাহনালীর জবানবন্দীতে দেয়া এইসব অভিযোগ জুমন আলী প্রধানকে শোনানো হয়। বিষ্ময়ে হতবাক ও হতবিহ্বল হয়ে পড়ে সে। নিজেকে নিরুপায় মনে করে জুমন। ওরা আত্মীয় হয়ে এমন ষড়যন্ত্র করে এতো বড়ো ফাঁদ পাততে পারে একথা কল্পনাতেও আসেনি তার। থানায় জিজ্ঞাসাবাদের পর জুমন আলী প্রধানসহ আর সব ধৃত অভিযুক্তকে কোর্টে চালান দেয়া হলো।
নিঃসীম স্তব্ধতা। বৈরী প্রকৃতির ক্রুরতার অভিসম্ভাবী বহিঃপ্রকাশ। ঝড় আসতে পারে। ঝড় বয়ে যাচ্ছে তহরজানের মনের ভেতরে। বড়ো আশঙ্কার আঁধার ঘনিয়ে রাত নেমেছে। আকাশে জমেছে কালো মেঘ। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। তারচেয়েও বেশি অন্ধকার তহরজানের ঘরে এসে জমাট বেধেছে। বাড়ির মালিক বিনা দোষে হাজতবাস করছে। সন্তানদের মধ্যে একমাত্র হাসেম ছাড়া আর সবাই অবুঝ। কাশেম একরোখা, একগুঁয়ে। যা ভালো মনে করে তাই করে বসে। মোমতাজ মাষ্টার এ বাড়ির গৃহশিক্ষক হয়েও যতটা সম্ভব করে যাচ্ছেন। তিনি সম্মানী লোক, গাজীপুর হাইস্কুলের শিক্ষক। তাকে এলাকায় সকলেই সমীহ করে। থানার বড় দারোগা মানে ওসির সাথে ভালো জানাশোনা। প্রধান সাহেব যে নির্দোষ এবং তিনি এক গভীর ষড়যন্ত্রের শিকার এই কথা ওসি সাহেবকে বোঝাতে পেরেছেন তিনি। তবে আইন চলে নির্দেশিত নিজস্ব পথে,নির্দিষ্ট গতিতে। তথ্য, উপাত্ত ও যুক্তিতর্কের ভিত্তিতে এখানে সত্যমিথ্যার যাচাই হয়।
বাড়িতে খালেক, মালেক,বারেক, রশীদের হৈচৈয়ে অস্থির তহরজান, সর্বক্ষণ ওদের দুরন্তপনার রাজত্ব চলছে। মারামারি, কান্নাকাটি, অভিযোগ আবার একত্রে বসে খেলাধূলা, হাসাহাসি এতোসবে অতিষ্ঠ তহরজান। এতবড় সর্বনাশ ঘটে গেছে, পুলিশ এসে তাদের বাবাকে ধরে নিয়ে গেছে, এসব যেন কিছুই না ওদের কাছে। সরজান খাতুনের ঘরে আবার সন্তান এসেছে। তার নাম রেখেছে মনোয়ারা। রশীদের সমান বয়সী। খাতুনের পক্ষেও ছোট বাচ্চা নিয়ে এবাড়িতে বেশিক্ষণ সময় দেয়া সম্ভব হয়না। কাদিগড় থেকে তার শাশুড়ী নগরিবিবি এসেছিলেন। দু’দিন থেকে তহরজানের দুর্দশা দেখে লালজানকে পাঠিয়ে দিলেন। তার ছোটমেয়ে আনোয়ারাকে সঙ্গে নিয়ে এসেছিলো সে। লালজান আবার সন্তান সম্ভবা। তার ৫ম সন্তান আসছে। নিজেই অসুস্থ। হাটতে চলতেই পারেনা। তহরজানের দুঃসময়ে কাছে থাকতে চেয়েছিলো। এখন নিজেই বমি করে অসুখ বাঁধিয়ে বসেছে। তার বিপদ দেখে হাসেম মহিষের গাড়িতে করে তাকে তাদের বাড়িতে গিয়ে দিয়ে এলো। গৃহস্থালি দেখাশোনা করে দুই বিশ্বস্থ কামলা শুক্কুরালী আর আমীরালী। তহরজানের ছোট জা জয়গুন প্রায়দিন তাকে সান্ত্বনা দিতে আসে। সাথে করে নিয়ে আসে ফলমুল, এটাসেটা। সিঙ্গারদিঘী যাওয়া আসার পথে রহিমাও তার সঙ্গে খানিকক্ষণ সময় কাটিয়ে যায়। বড় ভাশুর অলি প্রধানের মেয়ে সমবয়সী রহিমার সাথে তার সখ্যতা বড় প্রধানবাড়িতে বউ হয়ে যাবার পর থেকে। রহিমার বিয়ের পর থেকে তারা একত্রে হলেই দু’জন দুজনের মনের কথা বিনিময় করে। সিঙ্গারদিঘীর ধনাঢ্য গৃহস্থ রমজান মাদবরের ছেলে কলিমউদ্দিনের সঙ্গে বিয়ে হয়েছে তার। রহিমার বড় ছেলে মোবারক হোসেন, কাশেমের চেয়ে সামান্য বড়, তারপর ফিরোজা, আরও দুই ছেলে সিরাজ ও আলী আকবর। মহিষের গাড়ি করে রহিমা প্রায়ই তার ছোট ছেলে আলী আকবর ও মেয়ে ফিরোজাকে সঙ্গে নিয়ে এই পথে বড় প্রধানবাড়ি (বাবার বাড়ি) যাতায়াত করে। বড় ছেলে মোবারক হোসেন অধিকাংশ সময় নানাবাড়িতে কাটায়। গফুর প্রধানের জ্যেষ্ঠ সন্তান ইসমাইলের সঙ্গে স্কুলে যায়। দুই মামা ভাগ্নের মধ্যে সম্পর্ক বন্ধুর মতো। আজ সকালে গফুর প্রধান এসে তরতরকারি কিনে দিয়ে গেছে। বড়ভাই অলি প্রধান নেয়ামত সরকারকে সঙ্গে নিয়ে জেলগেটে গিয়ে জুমনের সঙ্গে দেখা করে এসেছেন। তহরজানকে সে খবর জানিয়ে গেছেন অলি প্রধান। জুমন শক্তমনের মানুষ। সে বিশ্বাস করে সত্য প্রকাশিত হবে এবং বিপদ কেটে যাবে। নিয়ামত এসে খালেক আর মালেককে কাদিগড় নিয়ে গেলো। বললো,”রেজাক আর বারুর সাথে মিললা খেলবে। কয়দিন থাহুক আমার এহানে।” রেজাক মানে রাজ্জাক আর বাররু হলো বারেক। এই নামগুলোর সাথে এই দেশের প্রায় পরিবারেই কারো না কারোর নামের সঙ্গে মিলে যায়। মুসলিম সমাজে সন্তানের নাম আল্লাহর নামে রাখার রেওয়াজ আছে। অবশ্য এই নামগুলো উচ্চারণের আগে আবদুল বলতে হয়। সরাসরি আল্লাহর নামে কাউকে ডাকা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিধিসম্মত নয়। আবদুল আরবী শব্দ যার অর্থ বান্দা বা দাস। আবদুর রাজ্জাক, মানে রিজিক দাতার( রাজ্জাক) দাস,তেমনি আবদুল খালেক মানে সৃষ্টিকর্তার( খালেক) দাস। প্রতি মুসলিমের ঘরে এগুলো খুব প্রচলিত নাম।
মায়ের পাশে শুয়ে আছে তিন সন্তান। পাশাপাশি শুয়েছে পাঁচ বছর বয়সের বারেক, তার ছোট রশীদ ও ছয়মাসের শিশু বকুল। বারেকের গায়ে জ্বর,খুক খুক কাশে। তার গায়ে কাঁথা জড়িয়ে দেয় তহরজান। বারেক কাঁথা সরিয়ে পা দিয়ে ঠেলে আর বলে, “বড় খেতা কা?” জ্বরের ঘোরে শীতে কাঁপছে তবু গায়ে কাঁথা জড়াবে না। সে ঘুমিয়ে গেলে আবার তার গায়ে কাঁথা তুলে দেয় তহরজান। পাশে রশীদ নির্বিঘ্নে ঘুমোচ্ছে। সেও মায়ের দুধ খেতে চায়। জেগে উঠেই বকুলের মুখ সরিয়ে সে নিজে মায়ের বুকে মুখ রাখে। বকুল কান্না জুড়ে দেয়। রশীদের পিঠে একটা থাপ্পড় দিয়ে তাকে সরিয়ে দেয় তহরজান। বলে,” মুদ্দুইডা আমার মাইয়াডারে খাইতে দেয়না। যা এইহানথে-“। মায়ের বুকে মুখ ডুবিয়ে চুক চুক করে দুধ খায় বকুল। দুধ ভরা মায়ের স্তন মুখে টানতে টানতে আবার কখন ঘুমিয়ে পড়ে শিশুটি। ঘুম আসেনা তহরজানের চোখে। প্রায় রাত তার বিনিদ্র কাটে। ঘরের ভেতর অন্ধকারের মধ্যে তিন সন্তানের গায়ে হাত রেখে আদর করে সে। বাইরে বৃষ্টির ছোপ ছোপ বৃষ্টির শব্দ শুনে। টিনের চালে পড়ে বৃষ্টির সেই শব্দ অদ্ভুত সুরধ্বনির সৃষ্টি করে। বৃষ্টি নামে তহরজানের চোখে। অবিরল ধারার সেই বৃষ্টি আর থামেনা।
Leave a Reply