শ্রেণিকক্ষ থেকে কর্মক্ষেত্র: শিক্ষার নতুন ভাবনা: প্রফেসর ড. মোঃ আবু তালেব

শ্রেণিকক্ষ থেকে কর্মক্ষেত্র: শিক্ষার নতুন ভাবনা: প্রফেসর ড. মোঃ আবু তালেব

নজমুল হক,গাজীপুর


একটি দেশের উন্নয়নের মূল শক্তি তার মানুষ। আর দক্ষ মানুষ তৈরি করে শিক্ষা। কিন্তু শিক্ষা যদি কর্মজীবনের জন্য প্রস্তুত করতে না পারে, তবে সেই শিক্ষার উদ্দেশ্য পূরণ হয় না। আজ বাংলাদেশে এই প্রশ্নটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের শিক্ষা কি শুধু পরীক্ষায় পাস করাচ্ছে, নাকি জীবন ও কর্মক্ষেত্রের জন্যও প্রস্তুত করছে? স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে শিক্ষার অনেক উন্নতি হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী দেশের সাক্ষরতার হার এখন ৭৫ শতাংশের বেশি। দেশে সরকারি, বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক মিলিয়ে ১৭৭টি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। প্রায় প্রতিটি এলাকায় স্কুল ও কলেজ গড়ে উঠেছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি প্রায় শতভাগ। মেয়েদের শিক্ষায়ও বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। এসব অর্জন অবশ্যই গর্বের। তবে একটি বড় প্রশ্ন থেকেই যায়। এত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরও কেন শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে? কেন অনেক প্রতিষ্ঠান দক্ষ কর্মী খুঁজে পাচ্ছে না? উত্তরটি খুব সহজ। আমাদের শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রের মধ্যে এখনও বড় একটি দূরত্ব রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপে দেখা যায়, তরুণদের বেকারত্বের হার জাতীয় গড়ের তুলনায় বেশি। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা বারবার বলছে, বাংলাদেশে দক্ষ জনশক্তির ঘাটতি রয়েছে। অর্থাৎ চাকরির সুযোগ আছে, কিন্তু সেই কাজের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অনেক শিক্ষার্থীর নেই। এই সমস্যার অন্যতম কারণ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এখনও অনেকাংশে পরীক্ষাকেন্দ্রিক। শিক্ষার্থীরা ভালো নম্বর পাওয়ার জন্য পড়ে। মুখস্থ করে। কিন্তু বাস্তব সমস্যার সমাধান শেখে কম। কর্মক্ষেত্রে শুধু বইয়ের জ্ঞান যথেষ্ট নয়। সেখানে দরকার যুক্তি, বিশ্লেষণ, যোগাযোগ দক্ষতা, প্রযুক্তি ব্যবহার, দলবদ্ধভাবে কাজ করার অভ্যাস এবং নেতৃত্বের গুণ।
বিশ্ব এখন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিক্স, ডেটা সায়েন্স, সাইবার নিরাপত্তা এবং ডিজিটাল প্রযুক্তি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করছে। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী কয়েক বছরে বহু নতুন পেশা তৈরি হবে। আবার অনেক পুরোনো পেশার ধরন বদলে যাবে। তাই ভবিষ্যতের কর্মবাজারের জন্য আজ থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে। এজন্য শিক্ষা ব্যবস্থায় নতুন ভাবনা দরকার। শুধু পাঠ্যবই পড়লেই হবে না। বাস্তব শিক্ষা দিতে হবে। শিক্ষার্থীদের প্রকল্পভিত্তিক কাজ করতে হবে। গবেষণার সুযোগ দিতে হবে। উপস্থাপনা করতে হবে। সমস্যা সমাধানের অনুশীলন করতে হবে। প্রযুক্তি ব্যবহার শিখতে হবে। নতুন কিছু তৈরি করার সাহস দিতে হবে। পাঠ্যক্রমেও পরিবর্তন আনতে হবে। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, কৃষি, পরিবেশ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উদ্যোক্তা শিক্ষা এবং যোগাযোগ দক্ষতার ওপর বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। ইংরেজি ও তথ্যপ্রযুক্তির দক্ষতা বাড়াতে হবে। কারণ আজকের কর্মক্ষেত্র শুধু দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্ব এখন একটি বড় কর্মবাজার।


বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আরও বাস্তবমুখী হতে হবে। শুধু ডিগ্রি দেওয়া তাদের কাজ নয়। শিক্ষার্থীদের কর্মজীবনের জন্য প্রস্তুত করাও তাদের দায়িত্ব। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শক্তিশালী ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং সেল থাকতে হবে। ইন্টার্নশিপ বাধ্যতামূলক করতে হবে। শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ বাড়াতে হবে। তাহলে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার সময়ই কর্মক্ষেত্র সম্পর্কে বাস্তব ধারণা পাবে।


কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে। উন্নত দেশগুলো দক্ষ কারিগরি জনশক্তির ওপর ভর করেই শিল্পায়নে সফল হয়েছে। বাংলাদেশেও আধুনিক শিল্প, কৃষি ও প্রযুক্তি খাতে দক্ষ কর্মীর চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। তাই কারিগরি শিক্ষাকে অবহেলা করলে চলবে না।
শিক্ষকদের ভূমিকাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। একজন ভালো শিক্ষক শুধু পাঠ্যবই পড়ান না। তিনি শিক্ষার্থীর চিন্তা বদলে দেন। আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলেন। তাই শিক্ষক নিয়োগে সর্বোচ্চ যোগ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিতে হবে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ করে তুলতে হবে।
গবেষণার ওপরও জোর দিতে হবে। উন্নত বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কার করে। নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও গবেষণার পরিবেশ শক্তিশালী করতে হবে। গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ দিতে হবে। আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা বাড়াতে হবে। শিক্ষায় বিনিয়োগকে ব্যয় হিসেবে দেখা ঠিক নয়। এটি দেশের ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ। ফিনল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের মতো দেশগুলো শিক্ষার মান উন্নত করেই অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। তাদের অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য বড় শিক্ষা।বাংলাদেশও উন্নত দেশ হওয়ার পথে এগোচ্ছে। সেই পথে সবচেয়ে বড় শক্তি হবে দক্ষ মানবসম্পদ। আর সেই মানবসম্পদ তৈরি হবে শ্রেণিকক্ষে। তাই শ্রেণিকক্ষকে বদলাতে হবে। শিক্ষা হতে হবে বাস্তবমুখী। শিক্ষা হতে হবে প্রযুক্তিনির্ভর। শিক্ষা হতে হবে দক্ষতাভিত্তিক। শিক্ষা হতে হবে কর্মসংস্থানমুখী। সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষক, অভিভাবক এবং শিল্পখাত—সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। শিক্ষাকে শুধু পরীক্ষার ফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। শিক্ষাকে জীবনের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। কর্মক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। আজকের শিক্ষার্থীই আগামী দিনের বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, কৃষিবিদ, প্রকৌশলী, শিক্ষক, উদ্যোক্তা ও রাষ্ট্রনায়ক। তাদের হাতে দেশের ভবিষ্যৎ। তাই এখনই সময় শিক্ষার নতুন পথ বেছে নেওয়ার। কারণ শ্রেণিকক্ষের শিক্ষা যদি কর্মক্ষেত্রের চাহিদার সঙ্গে মিলতে পারে, তাহলে বেকারত্ব কমবে, উৎপাদনশীলতা বাড়বে এবং দেশের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে। মনে রাখতে হবে, ভালো শিক্ষা শুধু একজন মানুষের জীবন বদলায় না। একটি পরিবার বদলায়। একটি সমাজ বদলায়। শেষ পর্যন্ত বদলে যায় পুরো দেশ। তাই আজকের সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার হোক—শ্রেণিকক্ষের প্রতিটি পাঠ যেন কর্মক্ষেত্রের প্রতিটি সাফল্যের ভিত্তি হয়ে ওঠে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.