জলবায়ুর অভিঘাতে কৃষির নতুন বাস্তবতা: প্রফেসর ড. মোঃ আবু তালেব

জলবায়ুর অভিঘাতে কৃষির নতুন বাস্তবতা: প্রফেসর ড. মোঃ আবু তালেব


নজমুল হক,গাজীপুর


বাংলাদেশের অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও জনজীবনের সঙ্গে কৃষির সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। যুগের পর যুগ এই দেশের মানুষ কৃষিনির্ভর জীবনযাপন করে এসেছে। কিন্তু আজ সেই কৃষিই সবচেয়ে বড় হুমকির মুখে। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের নির্মম আঘাতে বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশের কৃষির চিত্র, উৎপাদন ব্যবস্থা এবং কৃষকের জীবন। কখনও অতিবৃষ্টি, কখনও দীর্ঘ খরা, কখনও ঘূর্ণিঝড়, আবার কখনও নদীভাঙন ও লবণাক্ততার বিস্তার— প্রকৃতির এই অস্বাভাবিক আচরণ কৃষিকে দিন দিন অনিশ্চিত করে তুলছে। ফলে খাদ্য নিরাপত্তা, গ্রামীণ অর্থনীতি এবং কৃষকের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণায় বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতির দিক থেকে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর শীর্ষ সারিতেই রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০৫০ সালের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে কৃষি উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে এবং কোটি কোটি মানুষ জীবিকা সংকটে পড়তে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও বৃষ্টিপাতের অনিয়মিত ধরণ দেশের খাদ্য উৎপাদনে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ হলেও এখানকার কৃষি প্রকৃতিনির্ভর। দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ কৃষক এখনও সরাসরি আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করে চাষাবাদ করেন। ফলে জলবায়ুর সামান্য পরিবর্তনও কৃষিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। গত কয়েক বছরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এর ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে। কখনও আগাম বন্যায় হাওরের বোরো ফসল তলিয়ে গেছে, কখনও খরায় উত্তরাঞ্চলের কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, আবার দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততার কারণে চাষযোগ্য জমি কমে গেছে। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষি সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, বরগুনা ও পটুয়াখালীর বিস্তীর্ণ এলাকায় নদীর পানিতে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় ধান, সবজি ও ফল চাষ কঠিন হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ৩০ শতাংশ জমি বিভিন্ন মাত্রায় লবণাক্ততার শিকার। ফলে কৃষক বাধ্য হয়ে পেশা বদল করছেন অথবা চিংড়ি চাষের দিকে ঝুঁকছেন। এতে একদিকে খাদ্যশস্য উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে পরিবেশের ভারসাম্যও নষ্ট হচ্ছে।অন্যদিকে দেশের উত্তরাঞ্চলে খরার প্রকোপ বাড়ছে। রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও দিনাজপুর অঞ্চলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় সেচনির্ভর কৃষির খরচ বেড়ে যাচ্ছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় কৃষককে অতিরিক্ত খরচ করে সেচ দিতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, কিন্তু লাভ বাড়ছে না। ফলে অনেক কৃষক চাষাবাদে আগ্রহ হারাচ্ছেন।


হাওরাঞ্চলের পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনার হাওর এলাকায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আগাম বন্যা বারবার বোরো ধান নষ্ট করেছে। একটি মাত্র বন্যায় হাজার হাজার কৃষক নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। কৃষকের বছরের একমাত্র ফসল পানিতে তলিয়ে গেলে তার জীবনে নেমে আসে দুর্ভোগের অন্ধকার। অথচ এসব অঞ্চলে এখনও পর্যাপ্ত টেকসই বাঁধ, পানি ব্যবস্থাপনা ও আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। জলবায়ু পরিবর্তনের আরেকটি বড় প্রভাব পড়ছে ফসলের উৎপাদনশীলতার ওপর। তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে ধান, গম ও ভুট্টাসহ বিভিন্ন ফসলের ফলন কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, গড় তাপমাত্রা যদি ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পায়, তাহলে বোরো ধানের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে নতুন নতুন রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণও বাড়ছে, যা কৃষকদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো— জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব শুধু কৃষিতেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনীতিকেও হুমকির মুখে ফেলছে। কৃষি খাত এখনও দেশের মোট কর্মসংস্থানের বড় উৎস। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ সরাসরি কৃষির সঙ্গে যুক্ত। ফলে কৃষি ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার প্রভাব পড়ে পুরো অর্থনীতিতে। খাদ্য উৎপাদন কমে গেলে বাড়বে আমদানিনির্ভরতা, বাড়বে খাদ্যের দাম, বাড়বে দারিদ্র্য ও সামাজিক অস্থিরতা। এই সংকট মোকাবিলায় শুধু উদ্বেগ প্রকাশ করলেই হবে না; প্রয়োজন কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। প্রথমত, জলবায়ু সহনশীল কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। লবণাক্ততা, খরা ও বন্যাসহিষ্ণু নতুন জাতের ফসল উদ্ভাবন ও মাঠপর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে হবে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট ইতোমধ্যে কিছু সহনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে, কিন্তু সেগুলোর বিস্তার এখনও পর্যাপ্ত নয়। দ্বিতীয়ত, কৃষিকে প্রযুক্তিনির্ভর করতে হবে। আধুনিক সেচব্যবস্থা, স্মার্ট কৃষি প্রযুক্তি, আবহাওয়ার আগাম তথ্য ও ডিজিটাল কৃষি সেবা কৃষকের কাছে সহজলভ্য করতে হবে। কৃষককে শুধু প্রণোদনা দিলেই হবে না; তাকে প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তাও দিতে হবে।


তৃতীয়ত, নদী, খাল ও জলাধার পুনঃখনন এবং পানি ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিতে হবে। একদিকে খরায় পানি সংকট, অন্যদিকে অতিবৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা— এই দ্বৈত সমস্যা সমাধানে সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত জরুরি। উপকূলীয় অঞ্চলে টেকসই বাঁধ নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণেও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।সবচেয়ে বড় কথা, কৃষককে বাঁচাতে হবে। কারণ কৃষক বাঁচলে কৃষি বাঁচবে, আর কৃষি বাঁচলে বাঁচবে বাংলাদেশ। জলবায়ুর এই নির্মম আঘাতের মধ্যে কৃষক আজ সবচেয়ে অসহায় মানুষগুলোর একজন। উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসল নষ্ট হচ্ছে, কিন্তু ক্ষতিপূরণ ও সহায়তা অনেক ক্ষেত্রেই পর্যাপ্ত নয়। ফলে কৃষক ক্রমেই ঋণগ্রস্ত ও হতাশ হয়ে পড়ছেন। বাংলাদেশের উন্নয়নের গল্প যতই বলা হোক না কেন, কৃষিকে অবহেলা করে সেই উন্নয়ন টেকসই হবে না। জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর ভবিষ্যতের হুমকি নয়; এটি বর্তমান বাস্তবতা। আর সেই বাস্তবতার সবচেয়ে বড় আঘাত পড়ছে বাংলাদেশের কৃষিতে। তাই এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও জনজীবনে আরও বড় সংকট নেমে আসবে। সময়ের দাবি হলো— জলবায়ু সহনশীল কৃষিনীতি, প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি এবং কৃষকের জন্য শক্তিশালী সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা। কারণ বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ টিকিয়ে রাখতে কৃষিকে বাঁচানোর কোনো বিকল্প নেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published.