
প্রতিবেদক মোঃ রাকিব হোসেন তাবুক, সৌদি আরব
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতিতে পুরো অঞ্চলের বিমান চলাচল, আকাশপথের নিরাপত্তা এবং সাধারণ যাত্রীদের পরিবহনে ব্যাপক বিঘ্ন দেখা দিয়েছে। আঞ্চলিক এই অস্থিরতার জেরে সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশে ফিরতে ইচ্ছুক প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য বিমান টিকিটের চড়া মূল্য বড় ধরনের আর্থিক ও মানসিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিমানভাড়ায় বড় লাফ: ৮০০ রিয়ালের টিকিট ২ হাজার ছাড়ালসৌদি আরবের উত্তরাঞ্চলীয় শহর তাবুক থেকে ঢাকা রুটে যাতায়াতকারী প্রবাসীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, স্বাভাবিক সময়ে যেসব টিকিটের দাম প্রায় ৮০০ সৌদি রিয়াল ছিল, বর্তমানে সেগুলোর দাম বেড়ে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ রিয়াল বা তারও বেশি হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
একই রুটের টিকিটের দাম আড়াই থেকে তিন গুণ পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ায় সৌদি আরবে কর্মরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বা সংযোগকারী রুটের পরিবর্তন এবং টিকিটের চাহিদার তুলনায় নির্দিষ্ট কিছু তারিখে আসনের সংকটের কারণে বিমানভাড়া বেড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলা ও বিমান চলাচলে বিঘ্ন
সৌদি আরবের আকাশপথের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের সূত্রপাত ঘটে অক্টোবরের প্রথমার্ধে রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার খবর প্রকাশের পর।
১০ অক্টোবরের হামলা: অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (AP) ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০ অক্টোবর কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত এবং ৩০০ জনের বেশি আহত হন। নিহতদের মধ্যে আন্তর্জাতিক বিমানকর্মীসহ অন্তত দুজন বাংলাদেশি প্রবাসী রয়েছেন বলেও দাবি করা হয়েছে।পরবর্তী হামলা ও ক্ষয়ক্ষতি: ১১ অক্টোবর একই বিমানবন্দরে আবারও হামলায় হতাহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। এ হামলায় রানওয়ে ও টার্মিনালের অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। হামলার দায় ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা স্বীকার করেছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল: সংঘাতময় পরিস্থিতিতে নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে এয়ার ইন্ডিয়া, ইন্ডিগো, কাতার এয়ারওয়েজ, লুফথানসা, ফ্লাইদুবাই, ইতিহাদ, গালফ এয়ার ও আকাসা এয়ারসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনসের ফ্লাইট চলাচলে বিঘ্ন, সময়সূচির পরিবর্তন কিংবা বাতিলের খবর পাওয়া গেছে।সৌদি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (GACA) এবং সংশ্লিষ্ট বিমান সংস্থাগুলোর সিদ্ধান্তের কারণে ফ্লাইটের সময়সূচি ও রুটে পরিবর্তন এলে যাত্রীদের বিকল্প ফ্লাইট খুঁজতে হতে পারে। তবে এসব পরিবর্তনের কারণে তাবুক–ঢাকা রুটের ভাড়া কতটা বেড়েছে, তা নির্দিষ্ট তথ্য দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন।
মানবিক সংকট ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ঝুঁকি
যুদ্ধের প্রভাব কেবল আকাশপথেই সীমাবদ্ধ নয়। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইয়েমেনের সংঘাতপ্রবণ এলাকাগুলোতে নতুন করে ২ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং প্রায় ৮ লাখ মানুষের কাছে প্রয়োজনীয় মানবিক সহায়তা পৌঁছানো ব্যাহত হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (IMF) মূল্যায়ন অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ, জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন এবং বাণিজ্যিক অবকাঠামোর ক্ষতি আঞ্চলিক অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা বাড়াতে পারে।
কেন আকাশচুম্বী হচ্ছে বিমানভাড়া?
বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আকাশসীমায় বিধিনিষেধ, বিকল্প রুট ব্যবহার, ফ্লাইট বাতিল এবং নির্দিষ্ট সময়ে টিকিটের চাহিদা বেড়ে যাওয়া বিমানভাড়ার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। বিকল্প পথে ফ্লাইট পরিচালনার কারণে জ্বালানি ও পরিচালন ব্যয়ও বাড়তে পারে।তবে তাবুক–ঢাকা রুটে ভাড়া আড়াই গুণেরও বেশি বৃদ্ধির পেছনে এসব কারণের সুনির্দিষ্ট ভূমিকা জানতে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনসের বক্তব্য এবং একই তারিখের টিকিটের মূল্যতথ্য প্রয়োজন।
চরম আর্থিক অনিশ্চয়তায় প্রবাসী বাংলাদেশিরা
সৌদি আরবে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের একটি বড় অংশ সীমিত আয়ের মধ্যে জীবনযাপন করেন। অনেক প্রবাসী দেশে স্বজনদের কাছে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। আবার কারও ক্ষেত্রে ভিসা বা ভ্রমণসংক্রান্ত সময়সীমার কারণে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যাত্রা করা জরুরি হয়ে পড়ে।
প্রবাসীদের অভিযোগ, জমানো টাকা দিয়ে দেশে যাওয়ার পরিকল্পনা করলেও টিকিটের বাড়তি দাম তাঁদের বাজেটের বাইরে চলে যাচ্ছে। তাঁরা দ্রুত কূটনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা এবং বিমানভাড়া সহনীয় পর্যায়ে রাখার প্রত্যাশা করছেন।সংবাদ সংক্ষেপ: যুদ্ধ ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে বিমান চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হলে তার প্রভাব যাত্রী পরিবহন ও টিকিটের দামে পড়তে পারে। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে দেশে ফিরতে ইচ্ছুক প্রবাসীদের ভোগান্তি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

Leave a Reply