
নজমুল হক, গাজীপুর
বাংলাদেশ আজ এক জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি। একদিকে উচ্চশিক্ষিত তরুণের সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র সংকুচিত হচ্ছে। প্রতিবছর লক্ষাধিক তরুণ বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ থেকে ডিগ্রি নিয়ে বের হলেও তাদের বড় একটি অংশ উপযুক্ত চাকরি পাচ্ছে না। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশের যুব বেকারত্বের হার এখনও উদ্বেগজনক; বিশেষ করে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যেই বেকারত্ব বেশি। অথচ এই তরুণ শক্তিকে যদি কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা যায়, তাহলে বেকারত্ব কমানোর পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতেও নতুন গতি আসতে পারে। বাস্তবতা হলো— বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতির অন্যতম বড় শক্তি হতে পারে কৃষি উদ্যোক্তা।
বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল ভিত্তিগুলোর একটি এখনও কৃষি। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৩৫ শতাংশ মানুষ সরাসরি কৃষির সঙ্গে যুক্ত। কৃষি, মৎস্য ও বনজ খাত মিলিয়ে দেশের জিডিপিতে এ খাতের অবদান প্রায় ১১ থেকে ১২ শতাংশ। কিন্তু এত গুরুত্বপূর্ণ একটি খাতকে আমরা এখনও আধুনিক উদ্যোক্তা তৈরির ক্ষেত্র হিসেবে যথেষ্ট গুরুত্ব দিতে পারিনি। ফলে কৃষি নিয়ে তরুণদের মধ্যে আগ্রহ কমছে, আর শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো— আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এখনও চাকরিনির্ভর মানসিকতা তৈরি করছে। পরিবার ও সমাজ তরুণদের বিসিএস, ব্যাংক বা করপোরেট চাকরির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, দেশে সরকারি চাকরির সংখ্যা সীমিত। প্রতি বছর কয়েক হাজার পদের বিপরীতে লাখ লাখ আবেদন জমা পড়ে। ফলে বিপুলসংখ্যক শিক্ষিত তরুণ বছরের পর বছর বেকার থাকছেন। এই বাস্তবতায় কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তা তৈরিই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর বিকল্প। বর্তমান বিশ্বে কৃষি আর শুধু ধান-গম চাষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কৃষি এখন একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্প ও ব্যবসায়িক খাত। আধুনিক কৃষিতে প্রযুক্তি, উদ্ভাবন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, অনলাইন বিপণন, রপ্তানি ও গবেষণার বিশাল সুযোগ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশেও এখন ড্রোন প্রযুক্তি, স্মার্ট সেচ, জৈব কৃষি, হাইড্রোপনিক্স, ছাদ কৃষি, মাছ ও গবাদিপশুর খামার, ফল ও সবজি প্রক্রিয়াজাতকরণসহ কৃষির নতুন নতুন ক্ষেত্র গড়ে উঠছে। এসব খাতে তরুণরা উদ্যোক্তা হিসেবে সফল হতে পারলে শুধু নিজেদের কর্মসংস্থানই নয়, অন্যদের জন্যও চাকরির সুযোগ সৃষ্টি করতে পারবেন। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর কৃষিতে উৎপাদন কয়েকগুণ পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব। ইতোমধ্যে দেশের অনেক তরুণ অ্যাগ্রো-ফার্ম, ডেইরি, পোলট্রি, জৈব খাদ্য উৎপাদন ও কৃষিপণ্য অনলাইন বিপণনের মাধ্যমে সফলতার উদাহরণ তৈরি করেছেন। কেউ বিদেশে আম ও সবজি রপ্তানি করছেন, কেউ আবার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সরাসরি কৃষিপণ্য বিক্রি করছেন। এসব উদ্যোগ প্রমাণ করে— কৃষিকে ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিচালনা করলে এটি অত্যন্ত লাভজনক খাতে পরিণত হতে পারে।
তবে সমস্যা হলো, কৃষিকে এখনও সমাজে মর্যাদাপূর্ণ পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। অনেক শিক্ষিত তরুণ কৃষিতে আসতে চান না, কারণ তারা মনে করেন এটি কষ্টসাধ্য ও অনিশ্চিত পেশা। অথচ বাস্তবে এখন অনেক কৃষি উদ্যোক্তার আয় চাকরিজীবীদের চেয়েও বেশি। উন্নত দেশগুলোতে কৃষিকে উচ্চপ্রযুক্তি ও লাভজনক শিল্প হিসেবে দেখা হয়, কিন্তু বাংলাদেশে এখনও কৃষককে অবমূল্যায়নের সংস্কৃতি বিদ্যমান। এই সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করা জরুরি।
কৃষি উদ্যোক্তা তৈরিতে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হলো অর্থায়নের সংকট। অনেক তরুণ কৃষিভিত্তিক ব্যবসা শুরু করতে আগ্রহী হলেও মূলধনের অভাবে পিছিয়ে যান। ব্যাংকঋণের জটিলতা, জামানতের শর্ত ও উচ্চ সুদের কারণে তারা সহজে ঋণ পান না। ফলে সম্ভাবনাময় উদ্যোগও অনেক সময় থেমে যায়। তাই তরুণ কৃষি উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, স্টার্টআপ ফান্ড ও ভর্তুকি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশে কৃষক প্রায়ই উৎপাদন খরচের তুলনায় কম দাম পান, কিন্তু ভোক্তাকে উচ্চমূল্যে পণ্য কিনতে হয়। এর প্রধান কারণ মধ্যস্বত্বভোগী ও দুর্বল বাজারব্যবস্থা। কৃষকের সরাসরি বাজারে প্রবেশ, কোল্ড স্টোরেজ বৃদ্ধি, কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ও অনলাইন বিপণন ব্যবস্থা উন্নত করা গেলে কৃষি আরও লাভজনক হবে। তরুণরা তখন কৃষিতে বিনিয়োগে আগ্রহী হবে।
কৃষি শিক্ষাকেও সময়োপযোগী করা জরুরি। শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞান দিয়ে নয়, বাস্তবভিত্তিক প্রশিক্ষণ, অ্যাগ্রো-বিজনেস ম্যানেজমেন্ট, ডিজিটাল মার্কেটিং ও প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি শিক্ষা চালু করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ পর্যায়ে “কৃষি উদ্যোক্তা উন্নয়ন” কোর্স চালু করা সময়ের দাবি। শিক্ষার্থীদের মাঠপর্যায়ে কাজের অভিজ্ঞতা দিতে হবে, যাতে তারা চাকরি খোঁজার পরিবর্তে নিজেরাই কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে।
সরকার কৃষি আধুনিকায়নের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে। কৃষিযন্ত্রে ভর্তুকি, কৃষকদের জন্য ডিজিটাল সেবা, কৃষি প্রণোদনা ও কৃষি কার্ড কার্যক্রম ইতিবাচক পদক্ষেপ। কিন্তু এসব উদ্যোগের বাস্তব সুফল নিশ্চিত করতে হলে দুর্নীতি, অনিয়ম ও তদারকির দুর্বলতা দূর করতে হবে। পাশাপাশি কৃষিকে জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রীয় খাত হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। বাংলাদেশের সামনে এখন দুটি পথ খোলা— একদিকে বাড়তে থাকা শিক্ষিত বেকারত্ব ও সামাজিক হতাশা, অন্যদিকে কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তা সৃষ্টি করে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করা। শুধু চাকরির পেছনে ছুটে বেকারত্ব সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন উৎপাদনমুখী অর্থনীতি এবং উদ্যোক্তানির্ভর সমাজ গঠন। আর সেই পরিবর্তনের অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম হতে পারে কৃষি। মনে রাখতে হবে, কৃষি শুধু খাদ্য উৎপাদনের খাত নয়; এটি কর্মসংস্থান, রপ্তানি, শিল্পায়ন ও গ্রামীণ অর্থনীতির প্রাণশক্তি। বাংলাদেশের তরুণদের হাতে যদি আধুনিক কৃষির প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও পুঁজি তুলে দেওয়া যায়, তাহলে কৃষিই হতে পারে নতুন অর্থনৈতিক বিপ্লবের ভিত্তি। তখন শিক্ষিত তরুণরা চাকরিপ্রার্থী নয়, চাকরিদাতা হিসেবে গড়ে উঠবেন। তাই সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি হলো— কৃষিকে মর্যাদা দেওয়া, কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে উৎপাদনমুখী অর্থনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত করা। কারণ বাস্তবতা পরিষ্কার— কৃষি উদ্যোক্তাই পারে বাংলাদেশের বেকারত্ব সংকটের টেকসই সমাধান দিতে।

Leave a Reply