
আশিকুর রহমান সবুজ, শ্রীপুর (গাজীপুর):
গাজীপুরের শ্রীপুরে মাওনা চৌরাস্তার ‘লাইফ কেয়ার হাসপাতাল’-এ ভুল চিকিৎসায় প্রসূতি মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত প্রতিবেদন ‘নেগেটিভ’ তথা হাসপাতালের বিপক্ষে আসার পরও চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে। গত ৯ মার্চ সিলগালা করা এই বিতর্কিত প্রতিষ্ঠানটি কোনো চূড়ান্ত বৈধ অনুমতি ছাড়াই কৌশলে মূল সাইনবোর্ডের “হাসপাতাল” শব্দটি নীল ব্যানার দিয়ে ঢেকে “ডায়াগনস্টিক সেন্টার” নামে রোগীদের সেবা দেওয়া শুরু করেছে। স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের সুযোগ নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি পুরোদমে তাদের বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালাচ্ছে এবং আগামী ঈদের পরই আবার অপারেশন থিয়েটার (ওটি) চালুর ঘোষণা দিয়েছে।
আজ সরেজমিনে মাওনা চৌরাস্তায় গিয়ে দেখা যায়, দীর্ঘ আড়াই মাস সিলগালা থাকা প্রতিষ্ঠানটির প্রধান ফটক খুলে দেওয়া হয়েছে। প্রধান সাইনবোর্ডের ‘লাইফ কেয়ার হাসপাতাল’ নামের শেষ অংশ ঢেকে দিয়ে সেখানে সাঁটানো হয়েছে নতুন ব্যানার, যেখানে লেখা রয়েছে ‘ডায়াগনস্টিক সেন্টার’।
হাসপাতালটি আসলেই চালু হয়েছে কি না এবং এখানে এখন অপারেশন হয় কি না—সংবাদকর্মীরা রিসিভশনে কর্তব্যরত এক ব্যক্তির কাছে জানতে চাইলে তিনি অকপটে তা স্বীকার করেন। তিনি জানান, “হাসপাতাল চালু হয়েছে, তবে ডায়াগনস্টিক সেন্টার হিসেবে। এখনো অপারেশন চালু হয়নি, ঈদের পর অপারেশন চালু হবে।” প্রতিষ্ঠানের ভেতরের কর্মীর এমন বক্তব্য স্পষ্ট করে দেয় যে, ডায়াগনস্টিক সেন্টারের নাম নেওয়াটা আইনি জটিলতা এড়ানোর একটি সাময়িক কৌশল মাত্র।
উল্লেখ্য, গত ৮ মার্চ উজিলাব গ্রামের মানিক মিয়ার স্ত্রী রুমা (২৫) সিজারিয়ান অপারেশনের পর ভুল চিকিৎসায় মারা যান বলে অভিযোগ ওঠে। ওই ঘটনার পরদিন ৯ মার্চ উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ড ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে হাসপাতালটি সিলগালা করেছিলেন।
তদন্ত রিপোর্ট এবং ভিন্ন নামে প্রতিষ্ঠান খোলার তোড়জোড় প্রসঙ্গে জানতে চাইলে শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোঃ শফিকুল ইসলাম জানান, ভুল চিকিৎসায় প্রসূতি মৃত্যুর ঘটনার তদন্ত রিপোর্ট ‘নেগেটিভ’ এসেছে। এই হাসপাতালের বিরুদ্ধে একাধিকবার এমন গুরুতর অভিযোগ আসার কারণে এটি পুনরায় চালুর অনুমতি দেওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না। তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, তিনি এই হাসপাতাল বা ডায়াগনস্টিক সেন্টার চালুর কোনো নির্দেশ দেননি এবং কার নির্দেশনায় এটি খোলা হয়েছে তাও তিনি জানেন না।
তবে এ বিষয়ে গাজীপুর জেলা সিভিল সার্জন ডা. মামুনুর রহমান-এর সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ভিন্ন তথ্য দেন। সিভিল সার্জন জানান, মাওনা লাইফ কেয়ার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠানটি চালুর জন্য আবেদন করেছিল। আবেদনের প্রেক্ষিতে তাদের হাসপাতাল অংশটি বাদ দিয়ে শুধুমাত্র ‘ডায়াগনস্টিক সেন্টার’ হিসেবে চালু করার একটি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল।
এ বিষয়ে স্থানীয় উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা কেন কিছুই জানেন না এবং নির্দেশনা অমান্য করে ঈদের পর ওটি চালুর পরিকল্পনা করা হচ্ছে কেন—এমন প্রশ্নের জবাবে সিভিল সার্জন বলেন, সিভিল সার্জন কার্যালয়ের নির্দেশনার বিষয়টি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষেরই উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে জানানো উচিত ছিল। তারা কেন স্থানীয় স্বাস্থ্য প্রশাসনকে না জানিয়েই সেবা দেওয়া শুরু করলো, তা তার জানা নেই।
এদিকে অভিযুক্ত হাসপাতাল পরিচালক মোঃ পারভেজ সাংবাদিকদের জানান, “আমি নিয়ম ও প্রক্রিয়া মেনেই প্রতিষ্ঠান চালু করেছি। আমাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার কাছে যেতে বা উনার অনুমতি নিতে বলা হয়নি। সিভিল সার্জনের অনুমোদন পাওয়ার পরই চলতি মাসের ৮ থেকে ১২ তারিখের মধ্যে যেকোনো দিন হাসপাতালের কার্যক্রম পুনরায় চালু করা হয়েছে।”
বাস্তব চিত্র ও স্বাস্থ্য প্রশাসনের কর্মকর্তাদের এমন পরস্পরবিরোধী অবস্থানে জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন, তদন্ত রিপোর্টে অপরাধের প্রমাণ মেলার পরও এবং সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে ‘শুধু ডায়াগনস্টিক সেন্টারের নির্দেশ’ দেওয়ার দাবি করার পরও কীভাবে একটি সিলগালা প্রতিষ্ঠান নাম বদলে পুরোদমে সেবা দিয়ে যাচ্ছে এবং ওটি খোলার সাহস দেখাচ্ছে? নিহতের স্বজনরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, চোখের সামনে অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে এবং কৌশলে প্রতিষ্ঠান খুলে ব্যবসা করছে, যা সম্পূর্ণ ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।

Leave a Reply