
মোঃ রেজাউল হক,স্টাফ রিপোর্টার, কুড়িগ্রাম:
জমি লিখে না দেওয়ায় ৮০ বছরের বৃদ্ধা মাকে বাড়িছাড়া করার অভিযোগ উঠেছে নিজ সন্তান ও কুড়িগ্রামের রাজারহাটের এক মাদ্রাসা ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে। অভিযোগ, বাবা-মায়ের জমিতে গড়ে তোলা বাড়িতে ছেলের বিলাসী জীবন, আর বৃদ্ধা মা দিন কাটাচ্ছেন জীর্ণ ঘরে। স্বামীর মৃত্যুর পর মেয়ের আশ্রয়ে কাঁথা সেলাই করে চলছে তাঁর জীবন।
ঘরের চাল-বেড়ার অসংখ্য ফুটো দিয়ে দিনে আসে সূর্যের আলো, রাতে চাঁদের আলো। বৃষ্টি নামলে ভিজে যায় বিছানা-বালিশ। এমনই এক ভাঙাচোরা ঘরে জীবনের শেষ সময় পার করছেন ৮০ বছরের মমেনা বেগম। অথচ বাবা-মায়ের জমিতে বাড়ি নির্মাণ করে সচ্ছল জীবন কাটাচ্ছেন ছেলে মোখলেছুর রহমান। তিনি কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার রাজমাল্লীরহাট সিদ্দিকীয়া ফাজিল মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ। প্রায় ১৪ বছর আগে আরও জমি লিখে দেওয়ার দাবি করেন ছেলে। কন্যা সন্তান থাকায় বাবা-মা তাঁকে কিছু জমি দিলেও তাতে সন্তুষ্ট হননি তিনি। এরপর তাঁকে ও তাঁর স্বামী আব্দুস সাত্তারকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। পরে মেয়ে খাদিজা বেগমের বাড়িতে আশ্রয় নেন তাঁরা। তার বাড়ি একই উপজেলার রাজমাল্লীরহাট মিস্ত্রীপাড়া গ্রামে। সেখানেই চার বছর আগে মারা যান আব্দুস সাত্তার। মমেনার অভিযোগ, বাবার জানাজায়ও অংশ নেননি ছেলে। নিজের বসতভিটায় স্বামীর দাফন করার ইচ্ছাও পূরণ হয়নি তাঁর।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মেয়ের সঙ্গে কাঁথা সেলাই করে কোনোরকমে চলে মমেনার সংসার। একদিকে জরাজীর্ণ ঘরে বৃদ্ধা মায়ের মানবেতর জীবন, অন্যদিকে ছেলের সচ্ছলতা, এই বৈপরীত্য নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়রা। বৃদ্ধ বয়সে সন্তানের কাছে আশ্রয় ও যত্ন পাওয়ার কথা যে মায়ের, সেই মাকেই এখন কাটাতে হচ্ছে অনিশ্চিত জীবন। একজন শিক্ষকের পারিবারিক আচরণ ও মানবিক দায়িত্ব নিয়ে উঠছে প্রশ্ন।
স্থানীয় বাসিন্দা ফারুক মিয়া বলেন, মোখলেছুর রহমানের বাবা মেয়ের বাড়িতে মারা গেলেও তিনি বাবার জানাজা ও দাফন-কোনোটিতেই যাননি। তাঁর অভিযোগ, মোখলেছুরের মা এখনো মেয়ের বাড়িতে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। ছেলে মায়ের কোনো খোঁজখবর বা আর্থিক সহায়তা দেন না; বরং বাবার রেখে যাওয়া জমিজমাও তিনি একাই ভোগদখল করছেন। সৈয়দ আলী বলেন, বাবার মৃত্যুর খবর পেয়েও মোখলেছুর দাফনে যাননি। তিনি বলেন, ‘শিক্ষিত হলেই মানুষ হওয়া যায় না। মায়ের প্রতি এমন আচরণ অত্যন্ত অমানবিক।’
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুর রশিদ বলেন, মোখলেছুরের মা-বাবা দীর্ঘদিন মেয়ের বাড়িতে আশ্রিত ছিলেন। সেখানেই তাঁর বাবা মারা যান। এখন বৃদ্ধ মা-ও সেখানেই কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন। তাঁর অভিযোগ, মোখলেছুর মাকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার পর আর কোনো খোঁজ রাখেননি
অভিযোগের বিনয়ে বক্তব্য জানতে মাদ্রাসা ও বাড়িতে গিয়েও মোখলেছুর রহমানকে পাওয়া যায়নি। ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি সাংবাদিকের সঙ্গে উত্তেজিত হয়ে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন বলে অভিযোগ। পরে বক্তব্য দেওয়ার কথা জানালেও একাধিকবার চেষ্টা করলেও তনি ফোন রিসিভ না করায় তাঁর সঙ্গে আর কথা বলা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয় উমর মজিদ ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আহসানুল কবির আদিল বলেন, প্রতিটি সন্তান তার বাবা-মাকে সর্বোস্ব দিয়ে সেবা করা উচিত, এটা আমাদের দায়িত্ব এবং কতব্য। এই পরিস্থিতিতে যদি কোন মানুষ গড়ার কারিগর একজন শিক্ষক তার বাবা মাকে ১৪বছর আগে তার বাড়ি থেকে বাহির করে দেয়ার বিষয়টি খুবই দুঃখ জনক। আমার কাছে অভিযোগ আসলে আমি বিনয়টি মিমাংসার উদ্যোগ গ্রহণ করতাম।
কুড়িগ্রামের রিশিষ্ট আইনজীবি অ্যাড, আহসান হাবিব নিলু বলেন সমাজে অবক্ষয় দেখা দিয়েছে। এটি পারিবারিক বন্ধন, সন্তানের যে দায়িত্ব বৃদ্ধ পিতা মাতার প্রতি সেটি তারা প্রতিপালন করছে না। পিতা মাতার ভরন পোষন আইন ২০১৩ সরকার এটি করেছে পিতা মাতার নিরাপত্তার জন্য। এই আইনে এমন অপরাধের জন্য জেল-জরিমানার বিধান রয়েছে।#

Leave a Reply