প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সবুজ বিপ্লবের সূচনা: প্রফেসর ড. মোঃ আবু তালেব

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সবুজ বিপ্লবের সূচনা: প্রফেসর ড. মোঃ আবু তালেব

নজমুল হক,গাজীপুর


একটি দেশের ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে বিদ্যালয়ে। আবার একটি দেশের পরিবেশও রক্ষা পায় মানুষের সচেতনতা থেকে। তাই শিক্ষা ও পরিবেশকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। একটি সবুজ বিদ্যালয় মানে শুধু গাছপালায় ঘেরা একটি ক্যাম্পাস নয়। এটি একটি সচেতন প্রজন্ম গড়ার ভিত্তি। এটি প্রকৃতিপ্রেমী নাগরিক তৈরির সূতিকাগার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কর্তৃক প্রাথমিক শিক্ষা পদক-২০২৬ প্রদান এবং দেশের প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে ‘সবুজ বিদ্যালয়’ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে গাছের চারা রোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন একটি সময়োপযোগী উদ্যোগ। এই উদ্যোগ সফল হলে এর সুফল বহু বছর ধরে দেশ পাবে। তবে কেবল চারা রোপণ করলেই হবে না। গাছ বাঁচাতে হবে। পরিচর্যা নিশ্চিত করতে হবে। বিদ্যালয়ের প্রতিটি শিশুকে এই উদ্যোগের অংশীদার করতে হবে।বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বিশ্বের অন্যতম দেশ। বিশ্বব্যাংক, জাতিসংঘ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদনে বারবার এই বাস্তবতা উঠে এসেছে। অতিবৃষ্টি, খরা, নদীভাঙন, লবণাক্ততা ও তাপপ্রবাহ এখন আমাদের নিত্যসঙ্গী। গত কয়েক বছরে দেশে গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা অনেক এলাকায় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করেছে। এতে শিশুদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হয়েছে।


বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বায়ুদূষণ প্রতিবছর বিশ্বে প্রায় ৭০ লাখ মানুষের অকালমৃত্যুর কারণ। বাংলাদেশেও বায়ুদূষণ একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। বিশেষ করে শহরাঞ্চলের শিশুরা এর সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী। গাছই পারে এই দূষণ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে। একটি পরিণত গাছ বছরে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে এবং অক্সিজেন সরবরাহ করে। তাই বিদ্যালয়ভিত্তিক বৃক্ষরোপণ পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি শিশুদের সুস্থ বিকাশেও সহায়ক।
বাংলাদেশে বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা প্রায় ৬৬ হাজারের বেশি। এসব বিদ্যালয়ে প্রায় দেড় কোটির কাছাকাছি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। যদি প্রতিটি বিদ্যালয়ে পরিকল্পিতভাবে অন্তত ৫০টি করে গাছ রোপণ ও সংরক্ষণ করা যায়, তাহলে সারা দেশে ৩৩ লাখেরও বেশি গাছের একটি বিশাল সবুজ ভাণ্ডার গড়ে উঠতে পারে। এটি শুধু একটি পরিবেশগত উদ্যোগ নয়। এটি একটি জাতীয় বিনিয়োগ। সবুজ বিদ্যালয় মানে শুধু ফলজ বা বনজ গাছ লাগানো নয়। বিদ্যালয় হতে পারে জীবন্ত শিক্ষাগার। সেখানে থাকবে ঔষধি গাছ। থাকবে ফুলের বাগান। থাকবে দেশীয় বৃক্ষ। থাকবে প্রজাপতি ও পাখির জন্য নিরাপদ পরিবেশ। শিক্ষার্থীরা বইয়ের পাশাপাশি প্রকৃতি থেকেও শিখবে। তারা বুঝবে জীববৈচিত্র্যের গুরুত্ব। শিখবে পরিবেশ সংরক্ষণের মূল্য।অনেক দেশ ইতোমধ্যে এই পথে এগিয়েছে। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর এবং ফিনল্যান্ডের বহু বিদ্যালয়ে পরিবেশ শিক্ষা বাধ্যতামূলক। বিদ্যালয় ক্যাম্পাসকে শিক্ষার অংশ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। শিশুরা নিজেরাই গাছ লাগায়। পরিচর্যা করে। এতে দায়িত্ববোধ বাড়ে। প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা জন্মায়। বাংলাদেশেও এই অভ্যাস গড়ে তোলার এখনই সময়।


প্রাথমিক শিক্ষা পদক শিক্ষার মানোন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এই স্বীকৃতি যেন শুধু পরীক্ষার ফল বা প্রশাসনিক সাফল্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। সবুজ ক্যাম্পাস, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, বৃক্ষ সংরক্ষণ, পানি সাশ্রয়, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং শিক্ষার্থীদের পরিবেশবান্ধব আচরণও মূল্যায়নের অংশ হওয়া উচিত। তাহলে বিদ্যালয়গুলো বাস্তব প্রতিযোগিতায় এগিয়ে আসবে।এই কর্মসূচি বাস্তবায়নে স্থানীয় সরকার, বন বিভাগ, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, অভিভাবক এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করতে হবে। প্রতিটি বিদ্যালয়ে একটি ‘সবুজ কমিটি’ গঠন করা যেতে পারে। শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের সমন্বয়ে এই কমিটি গাছের পরিচর্যা করবে। বছরে অন্তত দুইবার গাছের অবস্থা মূল্যায়ন করা যেতে পারে। গাছ লাগানোর পাশাপাশি শিশুদের হাতে পরিবেশ শিক্ষার বাস্তব অনুশীলন তুলে দিতে হবে। প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, জৈব সার তৈরি এবং বর্জ্য পৃথকীকরণের মতো ছোট ছোট কাজ বিদ্যালয় থেকেই শেখানো সম্ভব। এসব শিক্ষা ভবিষ্যতের নাগরিককে আরও দায়িত্বশীল করে তুলবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি গাছ শুধু ছায়া দেয় না। এটি জীবন দেয়। এটি মাটি রক্ষা করে। এটি বন্যপ্রাণীর আশ্রয় তৈরি করে। এটি জলবায়ুর ভারসাম্য রক্ষা করে। আজ যে শিশু একটি গাছ লাগাবে, আগামীকাল সেই শিশুই পরিবেশ রক্ষার নেতৃত্ব দেবে। সবুজ বিদ্যালয় কর্মসূচিকে কোনো আনুষ্ঠানিকতা বানানো যাবে না। অতীতে নানা কর্মসূচিতে চারা লাগানো হলেও অনেক ক্ষেত্রে পরিচর্যার অভাবে তা টেকেনি। এবার সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি করা চলবে না। প্রতিটি গাছের দায়িত্ব নির্দিষ্ট শিক্ষার্থী বা শ্রেণির ওপর দেওয়া যেতে পারে। এতে গাছের প্রতি মমত্ববোধ তৈরি হবে। শিক্ষা কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষা হলো জীবন গড়ার প্রক্রিয়া। আর সেই জীবন যদি প্রকৃতির সঙ্গে যুক্ত না হয়, তবে সেই শিক্ষা কখনোই পূর্ণতা পায় না। তাই সবুজ বিদ্যালয় শুধু একটি প্রকল্প নয়। এটি একটি জাতীয় দর্শন। এটি টেকসই উন্নয়নের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। আগামীর বাংলাদেশকে নিরাপদ, সুন্দর ও বাসযোগ্য করতে হলে আজই বিনিয়োগ করতে হবে শিশুদের মধ্যে। বিদ্যালয়কে হতে হবে জ্ঞান, নৈতিকতা ও পরিবেশ সচেতনতার মিলনকেন্দ্র। প্রতিটি বিদ্যালয়ে একটি সবুজ চত্বর গড়ে উঠুক। প্রতিটি শিক্ষার্থী একটি গাছের অভিভাবক হোক। তাহলেই শিক্ষা হবে জীবনের জন্য। পরিবেশ হবে ভবিষ্যতের জন্য। আর বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে একটি সবুজ, সুস্থ ও টেকসই রাষ্ট্র হিসেবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.