
মোঃ নাসির উদ্দিন গাজীপুর জেলা প্রতিনিধি
গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫০০ শয্যার বিপরীতে অনেক সময় রোগীর সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ায় চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা বাড়ানোসহ ১৫ দফা দাবি জানিয়েছে গাজীপুর সিটির নাগরিক সমাজ। একই সঙ্গে হাসপাতালটিকে পর্যায়ক্রমে ১ হাজার শয্যায় উন্নীত করা, চিকিৎসক-নার্স-টেকনোলজিস্টের সংকট দূর করা এবং বিকল চিকিৎসা সরঞ্জাম দ্রুত সচল করার দাবি জানানো হয়েছে।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) হাসপাতালের পরিচালক মোঃ আমিনুল ইসলামের কাছে লিখিত দাবিপত্র দেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
দাবিপত্রে বলা হয়, গাজীপুর মহানগর ও জেলার বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রধান সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র হিসেবে হাসপাতালটিতে প্রতিনিয়ত রোগীর চাপ বাড়ছে। বহির্বিভাগে প্রতিদিন প্রায় ৪ হাজার থেকে সাড়ে ৪ হাজার রোগী চিকিৎসা নিতে আসছেন। এর সঙ্গে ডেঙ্গু রোগীর চাপ বাড়ায় হাসপাতালের শয্যা, চিকিৎসক, নার্স, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসা সরঞ্জামের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।
নাগরিক সমাজের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ৫০০ শয্যার হাসপাতালটিতে কোনো কোনো সময় ভর্তি রোগীর সংখ্যা প্রায় ১ হাজারে পৌঁছে যায়। ফলে ওয়ার্ডের পাশাপাশি বারান্দা ও মেঝেতেও রোগী রাখার প্রয়োজন হয়।
দাবিপত্রে আরও উল্লেখ করা হয়, হাসপাতালের ছয়টি লিফটের মধ্যে তিনটি বিকল রয়েছে। চারটি এক্স-রে মেশিনের একটি অচল। পাশাপাশি সিটি স্ক্যান সেবা ব্যাহত হওয়া এবং এমআরআই ও ল্যাবরেটরি সেবা সবসময় পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালিত না হওয়ার বিষয়েও উদ্বেগ জানানো হয়েছে।
বর্তমান ডেঙ্গু পরিস্থিতিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে পৃথক ও পর্যাপ্ত ডেঙ্গু বেড বা ওয়ার্ড চালু, ২৪ ঘণ্টা ডেঙ্গু পরীক্ষা, প্রয়োজনীয় স্যালাইন ও ওষুধ, রক্ত ও রক্তের উপাদান মজুত এবং গুরুতর রোগীদের জন্য আইসিইউ/এইচডিইউ সক্ষমতা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে নাগরিক সমাজ।
এ ছাড়া শিশু, বয়স্ক, গর্ভবতী নারী ও জটিল রোগীদের জন্য বিশেষ চিকিৎসা ব্যবস্থার পাশাপাশি ডেঙ্গু পরীক্ষায় রোগী ও স্বজনদের দীর্ঘ অপেক্ষা কমাতে ২৪ ঘণ্টা পরীক্ষার সক্ষমতা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে।
৫০০ থেকে ১ হাজার শয্যায় উন্নীত করার দাবিনাগরিক সমাজের ১৫ দফা দাবির মধ্যে অন্যতম হলো বর্তমান ৫০০ শয্যার হাসপাতালকে পর্যায়ক্রমে ১ হাজার শয্যায় উন্নীত করতে দ্রুত উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ। একই সঙ্গে টঙ্গীর শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতালকে ২৫০ থেকে ৫০০ শয্যায় উন্নীত করার দাবিও জানানো হয়েছে।
জরুরি বিভাগে পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও নার্স নিশ্চিত করে ডেঙ্গু, স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক ও দুর্ঘটনাসহ জরুরি রোগীদের দ্রুত ট্রায়াজ ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করার দাবি রয়েছে। পাশাপাশি সিনিয়র চিকিৎসকদের নিয়মিত ওয়ার্ড ভিজিট ও চিকিৎসকদের সময়ানুবর্তিতা নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে।
বিকল সিটি স্ক্যান, এক্স-রে ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি দ্রুত মেরামত বা প্রতিস্থাপন, ২৪ ঘণ্টা গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা-নিরীক্ষার সক্ষমতা এবং আইসিইউ, সিসিইউ, অপারেশন থিয়েটার, জরুরি বিভাগ, ল্যাবরেটরি, অক্সিজেন সিস্টেম ও লিফটের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও কার্যকর জেনারেটর ব্যাকআপ নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।রোগী ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা জোরদারের দাবিবহির্বিভাগের অতিরিক্ত রোগীর চাপ কমাতে টিকিট কাউন্টার বাড়ানো, দ্রুত রেজিস্ট্রেশন ও টোকেন ব্যবস্থাপনা চালু এবং উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ বাড়ানোর দাবি করা হয়েছে।
পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রীর পর্যাপ্ত মজুত, পরিচ্ছন্ন ওয়ার্ড ও ওয়াশরুম, বিশুদ্ধ পানি ও সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিশু ওয়ার্ডে পৃথক ব্রেস্টফিডিং রুম স্থাপনের দাবি রয়েছে।
দালালচক্র, রোগী হয়রানি, চুরি-ছিনতাই বন্ধে সিসিটিভি ও নিরাপত্তাকর্মী বাড়ানো এবং অভিযোগ ব্যবস্থাপনা জোরদারের পাশাপাশি আউটসোর্সিং জনবল নিয়োগে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার দাবিও জানানো হয়েছে।এ ছাড়া হৃদরোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য সিসিইউয়ের পাশাপাশি পর্যায়ক্রমে করোনারি অ্যাঞ্জিওগ্রাফি, কার্ডিয়াক ক্যাথেটারাইজেশন ল্যাবরেটরি ও প্রয়োজনীয় কার্ডিয়াক ইন্টারভেনশন সুবিধা চালুর দাবি জানানো হয়।
এ বিষয়ে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক মোঃ আমিনুল ইসলাম বলেন, গাজীপুরের মানুষের চিকিৎসাসেবার মান আরও উন্নত করতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আন্তরিকভাবে কাজ করছে। নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে উত্থাপিত ১৫ দফা দাবিকে গঠনমূলক ও ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।তিনি বলেন, রোগীর ক্রমবর্ধমান চাপ, বিশেষ করে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে রয়েছে। সীমিত সক্ষমতার মধ্যেও রোগীদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে চিকিৎসক, নার্স ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কাজ করছেন।হাসপাতালের নিজস্ব এখতিয়ারের মধ্যে থাকা বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে। আর জনবল, শয্যা বৃদ্ধি, বড় ধরনের যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের যেসব বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও সহযোগিতা প্রয়োজন, সেগুলো যথাযথভাবে উপস্থাপন করা হবে বলে জানান তিনি।

Leave a Reply