সৌদি আরবে হুথি হামলার নিন্দা এরদোয়ানের, যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে তুরস্কের পূর্ণ সমর্থনের আশ্বাস।

সৌদি আরবে হুথি হামলার নিন্দা এরদোয়ানের, যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে তুরস্কের পূর্ণ সমর্থনের আশ্বাস।

প্রতিবেদক: মোঃ রাকিব হোসেন

সৌদি আরবের ভূখণ্ডে হুথি গোষ্ঠীর হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। একই সঙ্গে সৌদি আরবের নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় দেশটির পাশে থাকার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন তিনি।১৩ অক্টোবর রাতে সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন এরদোয়ান। আলোচনায় মধ্যপ্রাচ্যের সর্বশেষ পরিস্থিতি এবং সৌদি আরবকে লক্ষ্য করে চালানো হামলার বিষয়টি উঠে আসে। তুরস্কের প্রেসিডেন্সির যোগাযোগ অধিদপ্তরের সরকারি বিবৃতি এবং আনাদোলু এজেন্সির প্রতিবেদনে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।


তুরস্কের সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়, সৌদি আরবের ভূখণ্ড লক্ষ্য করে হুথিদের চালানো হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন এরদোয়ান। হামলায় নিহত ব্যক্তিদের জন্য শোক প্রকাশের পাশাপাশি তাঁদের স্বজনদের প্রতি সমবেদনা জানান তিনি। আহত ব্যক্তিদের দ্রুত সুস্থতা কামনা এবং সৌদি আরব বর্তমান পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে পারবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তুর্কি প্রেসিডেন্ট।
সৌদি সংবাদমাধ্যম Arab News-এর প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং স্থিতিশীলতা জোরদারে দেশটির নেওয়া পদক্ষেপগুলোর প্রতি তুরস্কের পূর্ণ সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন এরদোয়ান।


রিয়াদের বিমানবন্দরে হামলায় প্রাণহানি, বাড়ছে উদ্বেগ
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে লক্ষ্য করে হামলার ঘটনায় আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।
Arab News এবং রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০ অক্টোবরের হামলায় বিমানবন্দর এলাকায় ১৩ জন নিহত এবং তিন শতাধিক মানুষ আহত হন। এর আগে ৭ ও ৮ অক্টোবর সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোতে হামলার ঘটনায় আরও প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়।


রয়টার্সের ৮ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠী সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা জোরদার করেছিল। হামলার ফলে বিমান চলাচল, বেসামরিক অবকাঠামো এবং জ্বালানি স্থাপনার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।
এদিকে ১৪ অক্টোবর রয়টার্সের আরেক প্রতিবেদনে সৌদি আরবের তেল অবকাঠামো ও বিমানবন্দরকে লক্ষ্য করে আরও হামলার হুমকির কথা উঠে এসেছে। হুথি গোষ্ঠী এসব পদক্ষেপকে সৌদি আরবের সামরিক কর্মকাণ্ডের প্রতিক্রিয়া হিসেবে তুলে ধরেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।তবে বিভিন্ন হামলার হতাহতের সংখ্যা ও ঘটনার বিবরণ আলাদা করে যাচাই করা জরুরি। সব ঘটনার সংখ্যা একত্রে কোনো একটি হামলার হিসাব হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না।
সৌদি আরবের পাশে চার দেশের যৌথ অবস্থানসৌদি আরবের নিরাপত্তার প্রশ্নে তুরস্কের অবস্থান শুধু দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। গত ১১ অক্টোবর তুরস্ক, সৌদি আরব, পাকিস্তান ও মিসর যৌথ বিবৃতিতে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হুথি হামলার তীব্র নিন্দা জানায়।তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়, রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন স্থাপনায় হামলায় বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি, আহত হওয়ার ঘটনা এবং অবকাঠামোর ক্ষতি আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।চার দেশ সৌদি আরবের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে। একই সঙ্গে হামলা বন্ধের আহ্বান জানিয়ে সৌদি আরবের নিরাপত্তা ও নাগরিকদের সুরক্ষায় দেশটির বৈধ প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করে।বিবৃতিতে হুথি গোষ্ঠীকে হামলার পরিণতির জন্য দায়ী করা হয় এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শান্তি-নিরাপত্তা বিঘ্নিত করতে পারে—এমন কর্মকাণ্ড বন্ধের দাবি জানানো হয়।


সৌদি-তুরস্ক-পাকিস্তান প্রতিরক্ষা সহযোগিতা
সৌদি আরবকে ঘিরে সাম্প্রতিক নিরাপত্তা সংকটের মধ্যে তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা সহযোগিতাও গুরুত্ব পাচ্ছে।রয়টার্সের ৭ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি আরবকে হুথিদের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষায় সহায়তা দিতে তুরস্ক প্রধানত প্রযুক্তিগত ও প্রতিরক্ষামূলক সহযোগিতা দিচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে সামরিক সরঞ্জাম, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং কৌশলগত পরিকল্পনায় সহায়তার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
তিন দেশের মধ্যে গত আগস্টে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়েও আলোচনা চলছে। ১২ অক্টোবর রয়টার্স জানায়, চুক্তিটি অনুমোদনের জন্য তুরস্কের পার্লামেন্টে পাঠানোর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।তবে চুক্তি অনুমোদন, প্রতিরক্ষামূলক সহায়তা প্রদান এবং সরাসরি সামরিক অভিযানে অংশগ্রহণ এক বিষয় নয়। রয়টার্সের ৮ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তার বিষয়ে আলোচনা করার কথা জানিয়েছিলেন। তুরস্কের সামরিক ভূমিকা সম্পর্কে কোনো সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করার ক্ষেত্রে তাই সরকারি ঘোষণা ও বাস্তবায়নের মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখা প্রয়োজন।


হুথি হামলা ঘিরে আঞ্চলিক সংঘাতের ঝুঁকি
ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের সংঘাত নতুন করে আঞ্চলিক নিরাপত্তার বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। সৌদি আরবের বিমানবন্দর ও জ্বালানি স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলার ঘটনা বাড়লে বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা, বিমান চলাচল এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক যোগাযোগ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষ করে লোহিত সাগর ও আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে পারে। এসব পথে বিঘ্ন ঘটলে জ্বালানি পরিবহন ও আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থায় প্রভাব পড়ার ঝুঁকি থাকে।
এ পরিস্থিতিতে তুরস্কের প্রকাশ্য সমর্থন সৌদি আরবের সঙ্গে আঙ্কারার কূটনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সম্পর্কের গুরুত্ব তুলে ধরছে। একই সঙ্গে চার দেশের যৌথ বিবৃতি থেকে বোঝা যায়, হামলা বন্ধ এবং সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে আঞ্চলিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তবে সংঘাতের ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর পরবর্তী পদক্ষেপ, প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থার কার্যকারিতা এবং কূটনৈতিক উদ্যোগের ওপর।
তথ্যসূত্র: তুরস্কের প্রেসিডেন্সির যোগাযোগ অধিদপ্তর, আনাদোলু এজেন্সি, Arab News, রয়টার্স এবং তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published.