নেশাগ্রস্ত অবস্থায় মহানবীকে অবমাননা করে ফেসবুকে পোস্ট, ইরানি তরুণীর মৃত্যুদণ্ডের আদেশ

নেশাগ্রস্ত অবস্থায় মহানবীকে অবমাননা করে ফেসবুকে পোস্ট, ইরানি তরুণীর মৃত্যুদণ্ডের আদেশ

প্রতিবেদক মোঃ রাকিব হোসেন

ইরানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে অবমাননার অভিযোগে নাজমেহ আমিনি নামে ২৩ বছর বয়সী এক তরুণীকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন আদালত। বন্ধুদের সঙ্গে হ্যালুসিনেশন সৃষ্টিকারী মাশরুম সেবনের পর বিভ্রান্ত অবস্থায় তিনি ওই পোস্ট করেছিলেন বলে আদালতে দাবি করেন। তবে তাঁর আত্মপক্ষ সমর্থনের যুক্তি গ্রহণ করেননি বিচারক। পৃথক একটি মামলায় জাতীয় নিরাপত্তার বিরুদ্ধে কর্মকাণ্ড ও সরকারবিরোধী প্রচারণার অভিযোগে তাঁকে ১২ বছর ছয় মাস এক দিনের কারাদণ্ডও দেওয়া হয়েছে।বুধবার (১৪ অক্টোবর) যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান, ভারতের ইন্ডিয়া টুডে এবং ইতালির সংবাদ সংস্থা আনসা প্রকাশিত প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। নরওয়েভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ইরান হিউম্যান রাইটসও গত ৯ অক্টোবর এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে।


ফেসবুক পোস্ট ঘিরে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নাজমেহ আমিনি ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর মাশহাদের বাসিন্দা এবং হিসাববিজ্ঞানের শিক্ষার্থী। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের সময় তাঁকে আটক করা হয়। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি পোস্টকে কেন্দ্র করে তাঁর বিরুদ্ধে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে অবমাননার অভিযোগ আনা হয়।ইরানের আইনে এ ধরনের অপরাধকে ‘সাব্ব আল-নবী’ বলা হয়। দেশটির ইসলামি দণ্ডবিধির ২৬২ ধারায় মহানবীকে অবমাননার অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে।
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আমিনিকে মাশহাদের ভাকিলাবাদ কারাগারে রাখা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে পৃথক দুটি মামলায় বিচারিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এক মামলায় অবমাননার অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড এবং অন্য মামলায় জাতীয় নিরাপত্তার বিরুদ্ধে কর্মকাণ্ড ও সরকারবিরোধী প্রচারণার অভিযোগে ১২ বছর ছয় মাস এক দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।


নেশাগ্রস্ত থাকার দাবি করেছিলেন তরুণী
ইরানের সংবাদপত্র খোরাসানের বরাতে দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, আদালতে আমিনি দাবি করেন, বন্ধুদের সঙ্গে সাইকেডেলিক বা হ্যালুসিনেশন সৃষ্টিকারী মাশরুম সেবনের পর বিভ্রান্ত অবস্থায় তিনি ওই মন্তব্য প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর আইনজীবীও ঘটনাটিকে অনিচ্ছাকৃত ভুল বা অসতর্কতাবশত প্রকাশিত বক্তব্য হিসেবে তুলে ধরেন,তবে বিচারক তাঁর এই যুক্তি গ্রহণ করেননি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিচারক প্রশ্ন তোলেন, তিনি যদি সত্যিই বিভ্রান্ত অবস্থায় থাকতেন, তাহলে একই অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের মতো সরকারবিরোধীদের নিয়ে কেন একই ধরনের মন্তব্য করেননি।
তবে সংশ্লিষ্ট পোস্টের সম্পূর্ণ বক্তব্য প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে পোস্টটির সুনির্দিষ্ট বিষয়বস্তু স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।


কারাগার থেকে আন্তর্জাতিক সহায়তার আবেদন
কারাগার থেকে প্রকাশিত একটি অডিও বার্তায় আমিনি জাতিসংঘ, আইনজীবী ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রতি তাঁর মামলাটি তদন্ত করে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন বলে দ্য গার্ডিয়ান ও ইন্ডিয়া টুডের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।নরওয়েভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ইরান হিউম্যান রাইটসের পরিচালক মাহমুদ আমিরি-মোগাদ্দাম এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত বক্তব্যের জন্য মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেওয়া মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে।মানবাধিকার সংস্থাটি আমিনির মৃত্যুদণ্ডের আদেশ বাতিল এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ওপর স্থগিতাদেশ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।


ইরানের আইনে কী বলা আছে?
ইরানের ইসলামি দণ্ডবিধির ২৬২ ধারায় মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে অবমাননার অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। তবে ২৬৩ ধারায় নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে কিছু ব্যতিক্রমের সুযোগ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় বক্তব্য দেওয়া বা অনিচ্ছাকৃতভাবে কিছু বলার বিষয়ও রয়েছে।
আমিনির মামলায় আত্মপক্ষ সমর্থনের এসব যুক্তি আদালত প্রত্যাখ্যান করেছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। বিষয়টি ঘিরে বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, অভিযুক্তের আইনি অধিকার এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।


ইরানে মৃত্যুদণ্ডের সংখ্যা নিয়ে উদ্বেগ
ইরান হিউম্যান রাইটসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে দেশটিতে ৬০০-এর বেশি মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। সংস্থাটি বলছে, মৃত্যুদণ্ডের ব্যাপক ব্যবহার নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগ বাড়ছে।তবে এই পরিসংখ্যান মানবাধিকার সংস্থার সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি; একে ইরান সরকারের আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।


মৃত্যুদণ্ডের আদেশ এখনো চূড়ান্ত নয়
নাজমেহ আমিনির মৃত্যুদণ্ডের আদেশ এখনো চূড়ান্ত হয়নি। ইরান হিউম্যান রাইটস এবং ভারতের ইন্ডিয়া টুডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটির সুপ্রিম কোর্টে এ আদেশের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ রয়েছে।এখন পর্যন্ত তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে আদালত মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন—এ তথ্যের সঙ্গে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার বিষয়টিকে এক করে দেখার সুযোগ নেই।ঘটনাটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মহলে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত বক্তব্যের কারণে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেওয়ার বিষয়টি ন্যায়বিচার, অভিযুক্তের আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।


সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান (যুক্তরাজ্য), ইন্ডিয়া টুডে (ভারত), ইরান হিউম্যান রাইটস (নরওয়েভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা), আনসা (ইতালি)।

Leave a Reply

Your email address will not be published.