ডিজিটাল যুগের গোলকধাঁধা: মূল্যবোধের বিবর্তন ও সামাজিক সংকট‎‎

ডিজিটাল যুগের গোলকধাঁধা: মূল্যবোধের বিবর্তন ও সামাজিক সংকট‎‎

আশিকুর রহমান সবুজ‎‎

সভ্যতার চাকা যত সামনের দিকে গড়িয়েছে, মানুষ তত বেশি যান্ত্রিক নির্ভর হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে একবিংশ শতাব্দীর এই তৃতীয় দশকে এসে আমরা এমন এক ডিজিটাল বিপ্লবের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, যা মানুষের জীবনযাত্রাকে আমূল বদলে দিয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় পৃথিবী এখন একটি গ্লোবাল ভিলেজ বা বিশ্বগ্রামে পরিণত হয়েছে। তথ্যের অবাধ প্রবাহ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আধিপত্য আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু এই চোখধাঁধানো উন্নয়নের আড়ালে আমাদের দীর্ঘদিনের লালিত সামাজিক মূল্যবোধ, নৈতিকতা এবং মানবিক সম্পর্কগুলো কি এক গভীর সংকটের মুখে পড়ে যাচ্ছে না? এই প্রশ্নটিই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় জিজ্ঞাসা।‎‎‎

সমসাময়িক সময়ে আমাদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো তথ্যের সত্যতা যাচাই করা। ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সহজলভ্যতার কারণে আজ যে কেউ তথ্য প্রচারকের ভূমিকা নিতে পারে। এর ফলে ‘গুজব’ বা ‘ফেক নিউজ’ দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ছে। একসময় সংবাদপত্রের প্রতিটি শব্দ ছিল বিশ্বাসযোগ্যতার প্রতীক, কিন্তু এখন লাইক, শেয়ার এবং ভিউ পাওয়ার প্রতিযোগিতায় তথ্যের গুণগত মান ও সত্যতা গৌণ হয়ে পড়েছে। কোনো একটি ঘটনা ঘটার সাথে সাথেই তার বিচার শুরু হয়ে যায় ভার্চুয়াল দুনিয়ায়। অথচ সেই তথ্যের সত্যতা বা এর পেছনে থাকা প্রেক্ষাপট নিয়ে কারো মাথাব্যথা নেই। এই প্রবণতাটি সমাজের মানুষের মধ্যে অসহিষ্ণুতা বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং অহেতুক সাম্প্রদায়িক বা সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করছে।‎‎

মানুষ সামাজিক জীব। একে অপরের সাথে সরাসরি ভাব বিনিময়, উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নেওয়া কিংবা বিপদে পাশে দাঁড়ানোই ছিল আমাদের চিরকালীন সংস্কৃতি। কিন্তু প্রযুক্তির অতি-ব্যবহার আমাদের সেই সামাজিক বন্ধনগুলোকে শিথিল করে দিচ্ছে। এখন একই ড্রয়িংরুমে বসে চারজন মানুষ চারদিকে মুখ করে নিজের স্মার্টফোনে ব্যস্ত থাকে। আমরা এখন সরাসরি কথা বলার চেয়ে মেসেঞ্জারে ইমোজি পাঠিয়ে অনুভূতি প্রকাশ করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। ফলে আমাদের অনুভূতির গভীরতা কমে যাচ্ছে। আমরা এখন পাশের বাড়ির মানুষের অভাব-অনটনের খবরের চেয়ে বিদেশের কোনো সেলিব্রিটির ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে বেশি আগ্রহী। এই যে ভার্চুয়াল জগতের মোহ, তা আমাদের সমাজকে এক অদ্ভুত একাকীত্বের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। পরিসংখ্যান বলছে, ডিজিটাল যোগাযোগ বাড়লেও মানুষের মানসিক অবসাদ ও একাকীত্ব আগের চেয়ে বহুগুণ বেড়েছে।‎‎

কিশোর ও যুবসমাজের নৈতিক অবক্ষয়‎একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার যুবসমাজের ওপর। কিন্তু বর্তমান সময়ের দিকে তাকালে দেখা যায়, আমাদের কিশোর ও তরুণরা ইন্টারনেটের অন্ধকার জগতে হারিয়ে যাচ্ছে। অনলাইন গেমিংয়ের আসক্তি, নিষিদ্ধ কন্টেন্টের সহজলভ্যতা এবং সাইবার অপরাধের সাথে যুক্ত হওয়া যেন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাঠ্যবই পড়ার চেয়ে তারা এখন শর্ট ভিডিও বা রিলস দেখে সময় কাটাতে বেশি পছন্দ করে। এর ফলে তাদের চিন্তা করার ক্ষমতা ও ধৈর্যশক্তি কমে যাচ্ছে। বড়দের প্রতি সম্মান প্রদর্শন বা ছোটদের প্রতি স্নেহ করার যে চিরন্তন শিক্ষা আমাদের পরিবারগুলো থেকে আসত, যান্ত্রিকতায় ডুবে থেকে সেই পারিবারিক শিক্ষা আজ ম্লান হতে বসেছে। তারা এমন এক কৃত্রিম জীবনের পেছনে ছুটছে, যার সাথে বাস্তবের কোনো মিল নেই।‎‎

বর্তমান সময়ের একটি অত্যন্ত পীড়াদায়ক দিক হলো মানুষের সহমর্মিতার অভাব। রাস্তায় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে কিংবা কেউ বিপদে পড়লে মানুষ এখন উদ্ধারের হাত বাড়ানোর আগে পকেট থেকে মোবাইল বের করে ভিডিও করতে শুরু করে। যেন বিপন্ন মানুষের কান্না বা রক্তক্ষরণ একটি ভালো কন্টেন্ট তৈরির উপকরণ মাত্র! ‘ফেসবুক লাইভ’ বা ভিউ পাওয়ার এই মানসিকতা আমাদের ভেতরের মানুষটিকে মেরে ফেলছে। আমরা অন্যের ব্যক্তিগত গোপনীয়তাকে সম্মান করতে ভুলে যাচ্ছি। মানুষের ব্যক্তিগত ভিডিও বা ছবি ছড়িয়ে দিয়ে তাকে সামাজিকভাবে অপদস্থ করা এখন এক ধরণের বিকৃত আনন্দে পরিণত হয়েছে। নৈতিকতার এই চরম ধস আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়ছে।‎‎

সমসাময়িক বিষয়ের আলোচনা পূর্ণ হবে না যদি কর্মসংস্থান ও বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে কথা না বলা হয়। একদিকে যখন প্রযুক্তির প্রভাবে নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা অটোমেশনের কারণে সনাতন পেশাগুলো হুমকিতে পড়ছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং নিত্যপণ্যের আকাশচুম্বী দাম। সাধারণ মানুষের জীবন আজ ওষ্ঠাগত। নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষের দীর্ঘশ্বাস আজ বাতাসের চেয়েও ভারি। বাজারের এই নিয়ন্ত্রণহীনতা এবং দুর্নীতি সমাজকে এক চরম অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই অর্থনৈতিক বৈষম্য সমাজে অপরাধপ্রবণতা বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি করছে।‎‎

পরিবেশের বিপন্নতা ও আমাদের উদাসীনতা‎উন্নয়নের নামে আমরা প্রকৃতিকে যেভাবে ধ্বংস করছি, তার মাশুল এখন দিতে হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনের মাধ্যমে। অসময়ে বৃষ্টি, তীব্র দাবদাহ কিংবা ভয়াবহ বন্যা—সবই আমাদের কর্মকাণ্ডের ফল। বনভূমি উজাড় করে অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং কলকারখানার বর্জ্য আমাদের বাস্তুসংস্থানকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। অথচ আমরা পরিবেশ রক্ষার চেয়ে ব্যক্তিগত বিলাসিতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আমরা এক বিষাক্ত ও বসবাসের অযোগ্য পৃথিবী রেখে যাচ্ছি, যা চরম অনৈতিকতার পরিচয় দেয়।‎‎

মুক্তির পথ কোথায়?‎এই বহুমুখী সংকট থেকে মুক্তির উপায় কী? প্রথমত, আমাদের আবারও পারিবারিক ও সামাজিক শিক্ষার ওপর জোর দিতে হবে। সন্তানের হাতে স্মার্টফোন তুলে দেওয়ার আগে তাকে নৈতিকতা ও মূল্যবোধের শিক্ষা দিতে হবে। তাকে শেখাতে হবে—প্রযুক্তি ব্যবহারের চেয়েও বড় হলো মানুষ হওয়া। শিক্ষা ব্যবস্থায় শুধু ডিগ্রি অর্জনের প্রতিযোগিতা নয়, বরং মানবিকতা ও পরমতসহিষ্ণুতার পাঠ অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।‎

দ্বিতীয়ত, ডিজিটাল সাক্ষরতা বাড়ানো প্রয়োজন। কোনো তথ্য পাওয়ার সাথে সাথে তা শেয়ার না করে যাচাই করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। সাইবার আইন কঠোর করার পাশাপাশি এর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published.