মৃত্যুবার্ষিকীতে স্ত্রীকে নিয়ে শ্রীপুর সাংবাদিক সমিতির সাধারণ সম্পাদকের আবেগঘন স্ট্যাটাস

মৃত্যুবার্ষিকীতে স্ত্রীকে নিয়ে শ্রীপুর সাংবাদিক সমিতির সাধারণ সম্পাদকের আবেগঘন স্ট্যাটাস

শামীম আল মামুন স্টাফ রিপোর্টার

​এক বছর আগে আজকের এই দিনে জীবনসঙ্গীকে হারিয়েছেন শ্রীপুর সাংবাদিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক, দৈনিক বর্তমান পত্রিকার শ্রীপুর প্রতিনিধি ও দৈনিক সংবাদ সংযোগ পত্রিকার গাজীপুর জেলা প্রতিনিধি সাংবাদিক মোঃ শাহাদত হোসাইন। দুই সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে একটি সুখী সংসার ছিল সাংবাদিক শাহাদত হোসাইনের।

​সবকিছু ভালোই চলছিল। কিন্তু প্রিয়তমা স্ত্রীর আকস্মিক মৃত্যুতে সেই সুখী জীবনে ঘটে ছন্দপতন। জীবনসঙ্গিনীর ১ম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাকে নিয়ে নিজের ফেসবুক ওয়ালে একটি আবেগঘন স্ট্যাটাস দেন তিনি। সেখানে তার বন্ধু তালিকার অনেকেই তাকে সমবেদনা ও সান্ত্বনা জানিয়েছেন; কেউ কেউ আবার স্ট্যাটাসটি পড়ে মন খারাপের কথা প্রকাশ করেছেন। কেউ কেউ চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি।

​পাঠকদের জন্য তার সেই আবেগঘন স্ট্যাটাসটি নিচে হুবহু তুলে ধরা হলো:“প্রিয়তমা স্ত্রীকে হারানোর আজ ১ বছর।

​প্রিয়জন হারানোর বেদনা যে কত কষ্টের, তা কেবল যে হারিয়েছে সেই বোঝে। ভালোবাসার মানুষটিকে ছাড়া হয়তো জীবন কেটে যাচ্ছে, কিন্তু সেই জীবনে ভালোলাগা, ভালোবাসা, সুখ-ছন্দ বা আনন্দ বলতে আর কিছু নেই। মানুষের জীবনে এমনও কিছু কষ্ট থাকে যেখানে সময়ও বড় অসহায়। সুখের সময়গুলো যত দ্রুত ফুরিয়ে যায়, কষ্টের সময়গুলো যেন ততই ধীরে চলে। সবকিছুই থমকে যায়। প্রিয়জনের প্রতিটি স্মৃতিকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকা প্রতিটি রাতই যেন এক কষ্টের কাব্য! তবুও শত কষ্টের মাঝে মুখে হাসি নিয়ে জীবনের প্রয়োজনে বেঁচে থাকতে হয়; প্রিয়জনের স্মৃতি বুকে নিয়ে পথ চলতে হয়। এই তো জীবন!

​মানুষ মরণশীল। নিশ্চয়ই সবাইকে একদিন পরম করুণাময় সৃষ্টিকর্তার ডাকে সাড়াদেতেই হবে—এর চেয়ে চিরন্তন সত্য আর কিছু নেই। তবুও কিছু মৃত্যু মানুষকে এতটাই একা করে দিয়ে যায় যা মেনে নেওয়া ভীষণ কঠিন। যে আগে চলে যায়, সে হয়তো মরে গিয়েও শান্তিতে থাকে; আর যে বেঁচে থাকে, তার জন্য প্রতিমুহূর্তে বেঁচে থাকাটাই যেন এক মৃত্যুময় যন্ত্রণা!

​গত বছর আজকের এই দিনে—পবিত্র শুক্রবার, ৮ আগস্ট ২০২৫, বিকেল ৫:৩০ মিনিটের দিকে—আমার ৬ ও ৮ বছরের দুটি কন্যাসন্তান এবং আমাকে একা করে আমার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী মাসুরা আক্তার ইন্তেকাল করেন। সে সময় সে ৮ মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিল। কত স্বপ্ন ছিল আমাদের অনাগত নবজাতক সন্তানকে নিয়ে!

​গত বছর ৭ আগস্ট (বৃহস্পতিবার) মধ্যরাতে হঠাৎ তার পেটে ব্যথা শুরু হয়। প্রথমে গ্যাসের ওষুধ দেওয়া হয়, কিন্তু ব্যথা না কমায় দেওয়া হয় ইনজেকশন। তবুও তার তীব্র যন্ত্রণা কমছিল না। এত কষ্ট সত্ত্বেও সে আমাকে বুঝতে দেয়নি, শুধু বলছিল পেটে ব্যথা করছে। সকালে মাওনা চৌরাস্তার একটি প্রাইভেট হাসপাতালে তাকে নিয়ে যাই। ডাক্তার দেখার পর বললেন, “রোগীর আইসিইউ (ICU) সাপোর্ট লাগবে।” মাওনা থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যে অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে ময়মনসিংহ সিবিএমসিবি (CBMCB) হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। রাস্তার যানজট ঠেলে বেলা ১১:৩০টার দিকে হাসপাতালে পৌঁছালাম। ডাক্তার প্রেশার ও পালস দেখেই বললেন, “রোগীর অবস্থা খুবই আশঙ্কাজনক, দ্রুত আইসিইউ সাপোর্ট লাগবে।” আমি বললাম, “আপনারা দ্রুত ব্যবস্থা নিন, টাকা-পয়সার কোনো সমস্যা নেই।”

​সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে তাকে আইসিইউতে নিতে প্রায় ৩০ মিনিট সময় লেগে গেল। আমি তখন একের পর এক ওষুধ আনতে দৌড়াদৌড়ি করছি। দুপুর ২:৫০ মিনিটে আমাকে আইসিইউ রুমে ডাকা হলো। ডাক্তার বললেন, “আপনার রোগীর অবস্থা খুবই খারাপ, তাকে লাইফ সাপোর্টে নিতে হবে।” আমি দ্রুত সায় দিয়ে বললাম, “যা করার দ্রুত ব্যবস্থা নিন।” ডাক্তার আরও বললেন, “আপনার রোগীর হার্টে তিনটি ব্লক ধরা পড়েছে।” আমি শুনে বাক্‌রুদ্ধ ও অবাক হয়ে গেলাম! কারণ মাত্র ১৬ দিন আগেই স্ত্রীর ইসিজি (ECG) ও ইকোকার্ডিওগ্রাম (Echocardiogram) করিয়েছিলাম; তখন ডাক্তার স্পষ্ট বলেছিলেন হার্টে কোনো সমস্যা নেই। এখন কেন বলছেন তিনটি ব্লক? ডাক্তার বললেন, “হার্টের সমস্যা এক ঘণ্টার মধ্যেও তৈরি হতে পারে।” আমি আকুতি জানিয়ে বললাম, “যেভাবেই হোক, আমার স্ত্রীকে দ্রুত সুস্থ করে তুলুন।” ডাক্তার বললেন, “আমরা চেষ্টা করছি, রোগীকে ইলেকট্রিক শক দিতে হবে।” এরপর তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “মা ও বাচ্চা—আপনি কাকে বাঁচাতে চান?” আমি এক মুহূর্ত না ভেবে বললাম, “আমার স্ত্রীকে বাঁচান!” ডাক্তার আবার নতুন করে আমার স্বাক্ষর নিলেন। এর ঠিক ৩০ মিনিট পর আমাকে আবারও আইসিইউতে ডাকা হলো। ডাক্তার গম্ভীর গলায় বললেন, “সরি, আমরা আপনার স্ত্রীকে বাঁচাতে পারলাম না!”

​এভাবে চোখের পলকে তোমার চলে যাওয়ার দৃশ্য আমি কিছুতেই মন থেকে মুছে ফেলতে পারি না। জীবন কি আসলেই এতটাই ক্ষণস্থায়ী?

​প্রিয় মাসুরা, তোমার দিবা মণি এখন প্রতিদিন মাদ্রাসায় যায়, অনেক মজার মজার কথা শিখেছে। তুবা মামণিও অনেক বড় হয়ে গেছে। তারা এখন আমাকে রীতিমতো শাসন করে! কিন্তু তোমার শাসনের ঘাটতিতে জানি না ওদের জীবন কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাবে কিনা। তবে আল্লাহ সহায় থাকলে আমাদের মামণিরা ইনশাআল্লাহ অনেক বড় হবে। নিজের ব্যস্ততা আর স্বভাবসুলভ দুর্বলতার কারণে ওদের হয়তো আমি সেভাবে শাসন করতে পারি না; তবে আমার বিশ্বাস, তোমার স্বপ্ন পূরণের পথে ওরা অটল থাকবে। তুবা কিন্তু লক্ষ্মী মেয়ের মতো পড়াশোনায় বেশ সিরিয়াস, সে নিজ দায়িত্বে পড়ে, খেলাধুলায় আগ্রহী আর গত বছর প্রায় সবগুলো রোজা রেখেছিল। নিয়মিত নামাজ পড়ে, মাঝেমধ্যে আমাকে সঙ্গে নিয়ে সালাত আদায় করে। তুবা পবিত্র কুরআন থেকে খুব সুন্দর তিলওয়াত করতে পারে; তোমার কবরের পাশে গিয়ে মাঝেমধ্যে সূরা ইয়াসিন তিলওয়াত করে। দিবামণিও কুরআন তিলওয়াত করে তোমার জন্য দোয়া করে। আমি সাধ্যমতো ওদের দাদা, দাদু, কাকা, কাকি, সুবর্ণা এবং বিশেষ করে সনিয়ার দুর্দান্ত সমর্থনে ওদের আগলে রাখার চেষ্টা করছি।

​তোমার অপূর্ণ স্বপ্নগুলো হৃদয়ে লালন করে, তীব্র কষ্ট বুকে চেপে হাসিমুখে বেঁচে আছি। তবে পেশাগত ব্যস্ততার কারণে ওদের খুব বেশি সময় দিতে পারি না গো। তুমি ১০টি বছর তিল তিল করে ঘরটা সাজিয়ে-গুছিয়ে দিয়ে এভাবে হঠাৎ চলে গেলে? তুমি যদি আমাদের সোনা বাচ্চাগুলোকে আর একটু গুছিয়ে দিয়ে জীবন থেকে ছুটি নিতে, তবেই না এই ভাঙাচোরা জীবনটা একটা স্বস্তির সফল পথচলা হতে পারত! নইলে কেউ কেউ মন থেকে, আর কেউ বা করুণা করে হয়তো বলেই ফেলবে—”জীবনযুদ্ধে হেরে গেলাম আমি।” কিন্তু আল্লাহ সহায় হলে আমি হারব না, ইনশাআল্লাহ।

​তোমার মৃত্যু হয়েছিল এক পবিত্র শুক্রবারে, তা-ও আবার গর্ভবতী অবস্থায়। ইসলামে গর্ভবতী অবস্থায় মৃত্যু হলে কিয়ামতের দিন শহীদের কাতারে শামিল করা হয়—তুমি নিশ্চিতভাবেই একজন শহীদ।

​ওপারে ভালো থেকো তুমি। তোমার চলে যাওয়ার ১টি বছর আমাকে প্রতি মুহূর্তে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে—কীর্তিমানের মৃত্যু নেই, আর সত্যিকারের ভালোবাসা কখনো হারায় না।

​হে আল্লাহ! আপনি আমার প্রিয়তমা স্ত্রীকে জান্নাতুল ফেরদাউস দান করুন, আমীন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.