
নজমুল হক, স্টাফ রিপোর্টার গাজীপুর
বাংলাদেশের উন্নয়নের গল্পে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্ত হয়েছে বহু অর্জনের অধ্যায়। অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ও ডিজিটাল রূপান্তরের পাশাপাশি মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রেও নতুন প্রত্যাশার জন্ম হয়েছে। সেই প্রত্যাশাকে আরও শক্তিশালী করেছে চলতি অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে শিক্ষাখাতে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ বরাদ্দ এবং জিডিপির ২ শতাংশ ব্যয়ের ঘোষণা। নিঃসন্দেহে এটি একটি ইতিবাচক ও প্রশংসনীয় পদক্ষেপ। কিন্তু প্রশ্ন হলো—শুধু বরাদ্দ বাড়লেই কি শিক্ষার মান বাড়বে? শিক্ষাব্যবস্থার দীর্ঘদিনের সংকট কি শুধুমাত্র অর্থ দিয়ে সমাধান করা সম্ভব? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের শিক্ষার বাস্তব চিত্রের দিকে তাকাতে হবে। স্বাধীনতার পাঁচ দশক পর বাংলাদেশে শিক্ষার বিস্তার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির হার ৯৮ শতাংশের কাছাকাছি। সাক্ষরতার হারও ৭৬ শতাংশের বেশি।
দেশে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে কয়েক হাজার কলেজ, শতাধিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং লক্ষাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। সংখ্যার বিচারে এটি অবশ্যই একটি সাফল্য। কিন্তু শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য কেবল বিদ্যালয়ে ভর্তি করানো নয়; বরং শিক্ষার্থীকে জ্ঞান, দক্ষতা ও মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ করে তোলা। আর এখানেই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিশ্বব্যাংক ও ইউনিসেফের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থী বয়স অনুযায়ী একটি সাধারণ পাঠ্যাংশ পড়ে তার অর্থ বুঝতে পারে না। এই অবস্থাকে বলা হয় “লার্নিং পোভার্টি” বা শেখার দারিদ্র্য। অর্থাৎ বিদ্যালয়ে উপস্থিতি থাকলেও শেখার ফলাফল আশানুরূপ নয়। শিক্ষার এই গুণগত সংকট দেশের ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য বড় হুমকি। একদিকে শিক্ষার হার বাড়ছে, অন্যদিকে দক্ষতার ঘাটতি বাড়ছে। প্রতি বছর লাখ লাখ শিক্ষার্থী উচ্চমাধ্যমিক, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করছে। কিন্তু চাকরির বাজারে প্রবেশের সময় দেখা যাচ্ছে, তাদের অনেকেরই বাস্তব দক্ষতার অভাব রয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি, যোগাযোগ দক্ষতা, সমস্যা সমাধান, গবেষণা ও উদ্ভাবনী চিন্তার ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকার কারণে অনেক শিক্ষিত তরুণ কর্মসংস্থানের সুযোগ হারাচ্ছে। ফলে শিক্ষিত বেকারত্ব ক্রমেই উদ্বেগজনক আকার ধারণ করছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর বিভিন্ন জরিপ অনুযায়ী, উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার তুলনামূলক বেশি। এর অন্যতম কারণ হলো শিক্ষা ও শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে অসামঞ্জস্য। অর্থাৎ আমরা ডিগ্রিধারী তরুণ তৈরি করছি, কিন্তু দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে পারছি না। এই বাস্তবতায় শিক্ষাখাতে বাড়তি বরাদ্দ অবশ্যই আশার আলো। তবে বরাদ্দের পরিমাণের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো এর ব্যবহার। অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, শিক্ষাখাতে বরাদ্দের একটি বড় অংশ অবকাঠামো নির্মাণ, প্রশাসনিক ব্যয় এবং বিভিন্ন প্রকল্পে ব্যয় হলেও শিক্ষার গুণগত উন্নয়নে তার প্রত্যাশিত প্রভাব দেখা যায়নি। অনেক ক্ষেত্রে নতুন ভবন হয়েছে, কিন্তু শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার মান বদলায়নি।শিক্ষার গুণগত রূপান্তরের কেন্দ্রে থাকতে হবে শিক্ষককে। কারণ একজন দক্ষ শিক্ষকই একটি জাতির ভবিষ্যৎ গড়ার কারিগর। অথচ দেশের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এখনও শিক্ষক সংকট রয়েছে। আবার অনেক শিক্ষক আধুনিক শিক্ষণ পদ্ধতি, প্রযুক্তিনির্ভর পাঠদান এবং গবেষণামূলক শিক্ষার সঙ্গে পর্যাপ্তভাবে পরিচিত নন। তাই বাড়তি বরাদ্দের একটি বড় অংশ শিক্ষক প্রশিক্ষণ, পেশাগত উন্নয়ন এবং কর্মদক্ষতা বৃদ্ধিতে বিনিয়োগ করা জরুরি।
একই সঙ্গে পাঠ্যক্রম ও মূল্যায়ন ব্যবস্থার সংস্কারও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মুখস্থনির্ভর শিক্ষা দিয়ে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে টিকে থাকা সম্ভব নয়। আজকের বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স, ডেটা সায়েন্স, সাইবার নিরাপত্তা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং ডিজিটাল দক্ষতা দ্রুত গুরুত্ব পাচ্ছে। অথচ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার অনেক অংশ এখনও অতীতের ধ্যানধারণায় আবদ্ধ। ফলে শিক্ষার্থী পরীক্ষায় ভালো ফল করলেও বাস্তব জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পিছিয়ে পড়ছে। গবেষণা খাতের অবস্থাও উদ্বেগজনক। বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষা ও গবেষণাকে সমান গুরুত্ব দেয়। অথচ বাংলাদেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ, আধুনিক ল্যাবরেটরি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সুযোগ সীমিত। আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় র্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান পিছিয়ে থাকার এটিও একটি বড় কারণ। জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়তে হলে গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বাড়ানো ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। শিক্ষাখাতে বরাদ্দের কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হলে জবাবদিহি ও সুশাসনও নিশ্চিত করতে হবে। দুর্নীতি, অপচয়, প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি এবং পরিকল্পনার দুর্বলতা অনেক সময় উন্নয়নের সুফলকে সীমিত করে দেয়। তাই প্রতিটি প্রকল্পের ফলাফল মূল্যায়ন, অর্থ ব্যবহারের স্বচ্ছতা এবং স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শিক্ষায় বৈষম্য। রাজধানী ও বড় শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ব্যবধান এখনও অনেক। কোথাও শিক্ষক নেই, কোথাও প্রযুক্তি নেই, কোথাও আবার মৌলিক অবকাঠামোর অভাব রয়েছে।
শিক্ষার প্রকৃত উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের একজন শিক্ষার্থীও শহরের শিক্ষার্থীর সমান সুযোগ পাবে।
বাংলাদেশ বর্তমানে স্মার্ট বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য শুধু প্রযুক্তি নয়, প্রযুক্তি ব্যবহারে সক্ষম মানবসম্পদও প্রয়োজন। আর সেই মানবসম্পদ তৈরির মূল ভিত্তি হলো মানসম্মত শিক্ষা। তাই শিক্ষাখাতে বাড়তি বরাদ্দকে কেবল একটি আর্থিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি জাতীয় ভবিষ্যৎ নির্মাণের একটি কৌশলগত বিনিয়োগ। সরকার শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে একটি সাহসী ও ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। এখন প্রয়োজন সেই অর্থকে শ্রেণিকক্ষের শিক্ষার মান, গবেষণার সক্ষমতা, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং শিক্ষার সমতা নিশ্চিত করার কাজে ব্যয় করা। কারণ শিক্ষা খাতে অর্থ ব্যয় করাই শেষ কথা নয়; সেই অর্থ শিক্ষার্থীর জ্ঞান, দক্ষতা ও সৃজনশীলতায় কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে, সেটিই প্রকৃত সাফল্যের মাপকাঠি।
অতএব, আজকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—শিক্ষায় বরাদ্দ বেড়েছে, কিন্তু মান কি সত্যিই বাড়বে? এর উত্তর নির্ভর করছে পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন, জবাবদিহি এবং গুণগত উন্নয়নের প্রতি আমাদের আন্তরিকতার ওপর। বরাদ্দের অঙ্ক নয়, শিক্ষার ফলাফলই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে এই বিনিয়োগ কতটা সফল হয়েছে। আর সেই সফলতার ওপরই নির্ভর করছে বাংলাদেশের আগামী দিনের অগ্রযাত্রা।

Leave a Reply