
নজমুল হক, স্টাফ রিপোর্টার গাজীপুর
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় এক অনন্য প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় (বাউবি)। দেশের নিয়মিত শিক্ষার্থী এবং কর্মজীবী, ঝরে পড়া কিংবা আর্থিক ও সামাজিক কারণে প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করতে পারছে না এমন মানুষের জন্য শিক্ষার দুয়ার খুলে দিয়েছে এই প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই বাউবি দূরশিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে শিক্ষা বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টি নতুন নেতৃত্বের অধীনে শিক্ষা, প্রশাসন ও গবেষণায় গুণগত পরিবর্তনের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। গত ১৭ মার্চ ২০২৬ তারিখে প্রফেসর ড. মোহাম্মদ সিদ্দিকুর রহমান খান বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের সাবেক ডিন এবং ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে দীর্ঘ একাডেমিক অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি বাউবির নেতৃত্বে আসেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তিনি বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি আধুনিক, দক্ষ, জবাবদিহিমূলক ও শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের লক্ষ্যে বিভিন্ন ইতিবাচক উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন।
বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষায় অংশগ্রহণের হার ক্রমবর্ধমান হলেও শিক্ষার মান, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং গবেষণার ক্ষেত্রে এখনও নানা সীমাবদ্ধতা বিদ্যমান। দেশের বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে বর্তমানে কয়েক মিলিয়ন শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত। এর মধ্যে বাউবির আওতায় বিভিন্ন শিক্ষা কর্মসূচিতে প্রতিবছর কয়েক লাখ শিক্ষার্থী যুক্ত হয়। ফলে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যকর নেতৃত্ব কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য নয়, জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাউবির অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো প্রযুক্তিনির্ভর দূরশিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও যুগোপযোগী করা। বিশ্বব্যাপী উচ্চশিক্ষায় ডিজিটাল রূপান্তর দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে। অনলাইন লার্নিং, ভার্চুয়াল ক্লাসরুম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক শিক্ষাসহায়তা এবং ডিজিটাল মূল্যায়ন এখন উন্নত বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সাধারণ বাস্তবতা। বাংলাদেশেও শিক্ষার্থীদের চাহিদা ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাউবিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে হবে। এ ক্ষেত্রে বর্তমান উপাচার্যের প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা সম্প্রসারণের উদ্যোগ বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি প্রশাসনিক গতিশীলতা বৃদ্ধি, শিক্ষাসামগ্রীর মানোন্নয়ন, অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম সম্প্রসারণ, গবেষণা উৎসাহিতকরণ এবং শিক্ষার্থীসেবার মান বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদ, বিভাগ এবং সারাদেশব্যাপী বিস্তৃত ১২টি আঞ্চলিক কেন্দ্র, ৮০টি উপআঞ্চলিক কেন্দ্র ও প্রায় ১৪০০ স্টাডি সেন্টারের কার্যক্রমে সমন্বয় বৃদ্ধির উদ্যোগও প্রশংসনীয়। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্য নির্ভর করে শুধু অবকাঠামোর ওপর নয়; বরং দক্ষ নেতৃত্ব, সুশাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপর। এ দৃষ্টিকোণ থেকে বর্তমান নেতৃত্ব নতুন প্রত্যাশার জন্ম দিয়েছে। তবে কেবল উদ্যোগ গ্রহণ করলেই হবে না; উদ্যোগের বাস্তবায়ন ও স্থায়িত্ব নিশ্চিত করাও জরুরি। বাউবির শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। তাদের জন্য সহজলভ্য ডিজিটাল শিক্ষা, দ্রুত ফল প্রকাশ, মানসম্মত টিউটোরিয়াল সহায়তা এবং দক্ষ একাডেমিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী পাঠ্যক্রম হালনাগাদ এবং গবেষণার ক্ষেত্র সম্প্রসারণও অপরিহার্য।
বিশ্ববিদ্যালয় র্যাঙ্কিং, গবেষণা প্রকাশনা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও বাউবিকে আরও এগিয়ে যেতে হবে। বর্তমানে বিশ্বের অনেক উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় অনলাইন শিক্ষার মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থীকে মানসম্মত শিক্ষা প্রদান করছে। বাংলাদেশের বৃহত্তম দূরশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাউবিরও সেই সক্ষমতা অর্জনের সুযোগ রয়েছে। এজন্য প্রয়োজন সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা, প্রযুক্তিগত বিনিয়োগ এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন।
আজকের বিশ্বে শিক্ষা কেবল সনদ অর্জনের মাধ্যম নয়; এটি মানবসম্পদ উন্নয়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং সামাজিক পরিবর্তনের প্রধান চালিকাশক্তি। বাংলাদেশকে উন্নত রাষ্ট্র গঠনের যে স্বপ্ন এদেশের জনগণ দেখছে, তা বাস্তবায়নে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাউবির মতো প্রতিষ্ঠান যদি প্রযুক্তিনির্ভর, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে দেশের লাখো শিক্ষার্থী সরাসরি উপকৃত হবে। প্রফেসর ড. মোহাম্মদ সিদ্দিকুর রহমান খানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রত্যাশা সৃষ্টি হয়েছে, তা বাস্তবে রূপ দিতে হলে সকল শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীকে একযোগে কাজ করতে হবে। নেতৃত্বের সাফল্য তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা প্রতিষ্ঠানের স্থায়ী উন্নয়নে রূপ নেয়। শিক্ষার উৎকর্ষ সাধনে বর্তমান উপাচার্যের নিরলস প্রচেষ্টা বাউবিকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেবে—এমন প্রত্যাশাই দেশের শিক্ষাপ্রেমী মানুষের।

Leave a Reply