
নজমুল হক গাজীপুর
এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়েছে। ফলাফলে বড় ধরনের অবনতি ঘটেছে। ২০২৬ সালের পরীক্ষায় ১১টি শিক্ষা বোর্ডে গড় পাসের হার ৫২.১২ শতাংশ। গত বছর এই হার ছিল ৫৮.৮৩ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ৬.৭১ শতাংশ। মোট পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৫ লাখ ৯৪ হাজার ১১৩ জন উত্তীর্ণ হতে পারেনি। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৪০ হাজার ৮৪ জন। গত বছর এই সংখ্যা ছিল ৬৯ হাজার ৯৭। আরও উদ্বেগের বিষয়, দেশের ২৯৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেনি। গত বছর এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ২০২টি। এসব পরিসংখ্যান আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার সামনে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। তবে ফলাফলের এই বিপর্যয়ের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটি ভুলে গেলে চলবে না। পরীক্ষার ফলাফল কখনোই জীবনের চেয়ে বড় হতে পারে না। একটি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া মানে জীবনে ব্যর্থ হওয়া নয়। জিপিএ-৫ না পাওয়া মানে মেধাহীন হওয়া নয়। একটি খারাপ ফলাফল কারও ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দিতে পারে না। জীবনে সফল হওয়ার অনেক পথ আছে। পরীক্ষার খাতায় কয়েকটি নম্বর কম পাওয়া সেই পথ বন্ধ করে দিতে পারে না। ফল প্রকাশের পর অনেক শিক্ষার্থী হতাশ হয়ে পড়ে। কেউ পরিবারের কাছে মুখ দেখাতে সংকোচ বোধ করে। কেউ বন্ধুদের সঙ্গে নিজেকে তুলনা করে। কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের ভালো ফল দেখে মানসিক চাপে ভোগে। আবার কেউ বাবা-মায়ের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারার কষ্টে ভেঙে পড়ে। এই সময়ে শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ভালোবাসা, সহানুভূতি ও মানসিক সমর্থন। প্রয়োজন এমন কিছু মানুষ, যারা তাদের পাশে দাঁড়িয়ে বলবে, ‘মন খারাপ করো না। এবার হয়নি, সামনে আবার চেষ্টা করবে। তোমার জীবন অনেক মূল্যবান।’ আত্মহত্যা কোনো সমস্যার সমাধান নয়। কোনো পরীক্ষার ফলাফলের জন্য নিজের জীবন শেষ করে দেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। জীবনের মূল্য একটি সনদ বা গ্রেডশিটের চেয়ে অনেক বেশি। আজ যে শিক্ষার্থী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেনি, আগামী দিনে সে-ই হয়তো একজন সফল উদ্যোক্তা, দক্ষ কর্মকর্তা, শিক্ষক, বিজ্ঞানী কিংবা সমাজসেবক হবে। তার সামনে সম্ভাবনার অসংখ্য দরজা খোলা রয়েছে। দরকার শুধু ধৈর্য, সাহস ও নতুন করে শুরু করার মানসিকতা। বাংলাদেশে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার ঘটনা আমাদের গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলছে। আঁচল ফাউন্ডেশনের এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে দেশে ৪০৩ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ৩১০। অর্থাৎ পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। অন্যদিকে, ২০২৬ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বাংলাদেশের সংবাদপত্রে প্রকাশিত ১৪২টি শিক্ষার্থী আত্মহত্যার ঘটনা বিশ্লেষণ করে দেখা হয়েছে। গবেষণায় পরীক্ষার ফল প্রকাশকে কিছু ক্ষেত্রে আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে এমন একটি উদ্দীপক ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব তথ্য আমাদের সতর্ক হওয়ার বার্তা দেয়। ফল প্রকাশের সময় শিক্ষার্থীদের মানসিক অবস্থার প্রতি বিশেষ নজর দিতে হবে।
এ ক্ষেত্রে অভিভাবকদের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো বাবা-মা সন্তানের জীবনের চেয়ে পরীক্ষার ফলকে বড় মনে করেন না। কিন্তু অনেক সময় অজান্তেই তাঁদের আচরণ সন্তানকে মানসিক চাপে ফেলে। অন্যের সন্তানের সঙ্গে তুলনা করা, বকাঝকা করা, অপমান করা কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় দেখানো কোনোভাবেই কাম্য নয়। সন্তান খারাপ ফল করলে তাকে দোষারোপ না করে কারণ খুঁজতে হবে। তার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে। তাকে বোঝাতে হবে, ফলাফল যা-ই হোক, পরিবার তার পাশে আছে। সন্তানের মানসিক কষ্টকে অবহেলা করা যাবে না। অস্বাভাবিক হতাশা, একাকিত্ব বা আচরণের পরিবর্তন দেখা গেলে দ্রুত পেশাদার সহায়তা নিতে হবে। শিক্ষার্থীদের প্রতিও কিছু কথা বলা জরুরি। পরীক্ষায় ভালো ফল করতে হলে শুধু পরীক্ষার আগে পড়াশোনা করলে হবে না। সারা বছর নিয়মিত পড়াশোনা করতে হবে। প্রতিদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে হবে। মনোযোগ দিয়ে শ্রেণিকক্ষে পাঠ গ্রহণ করতে হবে। শিক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হবে। বুঝতে অসুবিধা হলে প্রশ্ন করতে হবে। পাঠ্যবই ভালোভাবে পড়তে হবে। শুধু নোট, সাজেশন ও গাইডবইয়ের ওপর নির্ভর করলে প্রকৃত শিক্ষা অর্জন সম্ভব নয়।
মুখস্থনির্ভর পড়াশোনা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কোনো বিষয় শুধু মুখস্থ করে পরীক্ষার খাতায় লিখে ভালো নম্বর পাওয়াই শিক্ষার উদ্দেশ্য হতে পারে না। শিক্ষার মূল লক্ষ্য হলো বিষয়টি বোঝা, বিশ্লেষণ করা এবং বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে শেখা। নিজের চিন্তাশক্তি ও সৃজনশীলতা বাড়াতে হবে। নিয়মিত বই পড়তে হবে। সংবাদপত্র পড়তে হবে। বিজ্ঞান, সাহিত্য, ইতিহাস ও সমসাময়িক বিষয় সম্পর্কে জানতে হবে। প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহার শিখতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অযথা সময় নষ্ট না করে নিজের দক্ষতা উন্নয়নে মনোযোগ দিতে হবে। একজন শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের বলতে চাই, তোমাদের জীবনের লক্ষ্য শুধু একটি ভালো রেজাল্ট অর্জন করা হওয়া উচিত নয়। ভালো মানুষ হওয়া আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সততা, শৃঙ্খলা, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধ অর্জন করতে হবে। নিয়মিত ক্লাস করতে হবে। শিক্ষকদের নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে। সময়ের সঠিক ব্যবহার করতে হবে। নিজের দুর্বলতা চিহ্নিত করে তা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করতে হবে। মনে রাখতে হবে, নিয়মিত অধ্যবসায়ের বিকল্প নেই। আজকের ছোট ছোট প্রচেষ্টাই আগামী দিনের বড় সাফল্যের ভিত্তি তৈরি করে। এবার যারা পাস করতে পারেনি, তাদের বলব, হতাশ হওয়ার কিছু নেই। কোথায় ভুল হয়েছে, তা খুঁজে বের করো। প্রয়োজনে শিক্ষকদের সহায়তা নাও। দুর্বল বিষয়গুলোতে বেশি সময় দাও। নতুন পরিকল্পনা তৈরি করো। আবার পরীক্ষায় অংশ নাও। যারা প্রত্যাশিত ফল পাওনি, তারাও নিজেদের মূল্য কম ভেবো না। একটি পরীক্ষার ফলাফল তোমার মেধা, যোগ্যতা কিংবা সম্ভাবনার পূর্ণ পরিচয় নয়। ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এগিয়ে যাওয়াই প্রকৃত সাফল্য। তবে শুধু শিক্ষার্থীদের পরামর্শ দিলেই দায়িত্ব শেষ হবে না। শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতাগুলোও চিহ্নিত করতে হবে। ২৯৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোনো শিক্ষার্থী পাস না করার বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার পরিবেশ, শিক্ষকসংকট, শ্রেণিকক্ষে পাঠদান, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি এবং ব্যবস্থাপনা খতিয়ে দেখতে হবে। প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সহায়তা কার্যক্রম চালু করতে হবে। শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক কাউন্সেলিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষক ও অভিভাবকদেরও মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন করতে হবে।পাশের হার কমেছে বলে শুধু শিক্ষার্থীদের দোষারোপ করলে চলবে না। প্রশ্নপত্রের মান, মূল্যায়ন পদ্ধতি, পাঠদানের কার্যকারিতা এবং শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি—সবকিছু নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করতে হবে। পরীক্ষার ফলাফলের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করতে হবে। ফলাফল ভালো করার জন্য কোনোভাবেই মূল্যায়নের মান কমানো যাবে না। বরং শিক্ষার মান উন্নত করতে হবে। আমাদের লক্ষ্য শুধু পাসের হার বাড়ানো নয়। লক্ষ্য হতে হবে জ্ঞান, দক্ষতা, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন প্রজন্ম গড়ে তোলা।
আমরা এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা চাই, যেখানে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষাকে ভয় পাবে না। ভুল করলে শেখার সুযোগ পাবে। ব্যর্থ হলে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর সাহস পাবে। অভিভাবক সন্তানকে ফলাফলের ভিত্তিতে নয়, মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করবেন। শিক্ষক শুধু পরীক্ষার প্রস্তুতি দেবেন না, শিক্ষার্থীর জীবন গঠনের পথও দেখাবেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হবে জ্ঞানচর্চা, সৃজনশীলতা ও মানবিক বিকাশের কেন্দ্র। মনে রাখতে হবে, একটি পরীক্ষায় খারাপ ফলাফল জীবনের শেষ নয়। সামনে আরও অনেক পরীক্ষা আসবে। আরও অনেক সুযোগ আসবে। জীবন নিজেই একটি দীর্ঘ শিক্ষাপ্রক্রিয়া। সেখানে ধৈর্য, পরিশ্রম ও সততাই প্রকৃত সাফল্যের চাবিকাঠি। তাই কোনো শিক্ষার্থী যেন ফলাফলের কারণে নিজের জীবনকে তুচ্ছ মনে না করে। কোনো অভিভাবক যেন সন্তানের ওপর অমানবিক চাপ সৃষ্টি না করেন। কোনো শিক্ষক যেন হতাশ শিক্ষার্থীকে অবহেলা না করেন। আমাদের সবার সম্মিলিত বার্তা হোক—রেজাল্ট নয়, জীবনের মূল্য অনেক বেশি। এবার হয়নি, সামনে হবে। একটি দরজা বন্ধ হলে অন্য দরজা খুলবে। নিজের ওপর বিশ্বাস রাখো। নিয়মিত পড়াশোনা করো। বই পড়ো। সৃজনশীলতা বাড়াও। নৈতিক ও মানবিক মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলো। মনে রেখো, তোমার জীবন তোমার পরিবারের, সমাজের এবং দেশের কাছে অমূল্য সম্পদ। জীবনের কাছে কোনো পরীক্ষার ফলাফলই বড় নয়।

Leave a Reply