তিনকাল


কাজল মালেক
১৬শ পর্ব

প্রধান পরিবারে কিছু নাটকীয় ঘটনা ঘটে গেলো। কিছুদিন থেকে জুমন আলী প্রধানের সঙ্গে তার পিতৃতুল্য বড়ভাই অলি প্রধানের সম্পর্কের অবনতি ঘটতে থাকে। নতুন কেনা জমির মালিকানায় তার নাম না থাকায় জুমন ক্ষিপ্ত হয়। একান্নভুক্ত সংসার ছেড়ে আলাদা হয়ে যেতে চায় সে। তার শশুর জনাবালী মাদবরের সঙ্গে পরামর্শ করে, জানায় পৃথক হয়ে প্রধানবাড়ি ত্যাগ করবে বলে মনস্থির করেছে সে। জনাবালী মাদবর অসুস্থ। ঠান্ডায় জ্বর কাশিতে ভুগছেন। তহরজানকে ডাকেন তিনি। কি নিয়ে জামাইর রাগ হয়েছে জানতে চান তিনি। তহরজান শয্যাগত বাবার শিয়রে বসে বলে, “কি জানি অইছে বাবাজান,খালি রাগ করে। ভাইয়ে ভাইয়ে লাগালাগি, নিজেগর লগে নিজেগর কাইজ্জা, ভাল্লাগে না।”
জনাবালী মেয়ের হাত তার বুকে টেনে নিয়ে স্নেহকন্ঠে শুধান, “মা রে। সংসারে ঝগড়া কাইজ্যা হইয়াই থাহে। তার জন্য বাড়ি ছাড়তে অইবো?”
কিন্তু জুমনের জেদ ভাঙ্গবার নয়। তহরজান বলে, “মনে বড় দুক্কু পাইছে, ভাঙ্গা কলসি আর জোড়া লাগতোনা বাবাজান।”
“ঠিক আছে, তরা যা ভালা পাস কর। আমার পোলাগর লগেও তো জুমনের খাতির নাই, পারলে ত মারামারি করে। হগগলের লগে ঝগড়া ঝামেলা করলে চলবো? ভিন্ন হইলে কে তগর পাশে দাঁড়াইবো?” মাদবর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মেয়ের মুখের দিকে তাকান।
“ক্যান, তুমি আচোনা? জামাইরে ত সেইরম কিছু দেউনি। এই সময়ে তুমি তারে দেখবা।”
মেয়ের কথায় জনাবালীর বুঝতে বাকী থাকেনা, পৃথক হওয়ার বিষয়ে মেয়ের সায় আছে, ইচ্ছাও আছে। তহরজানের হাত ছেড়ে দিয়ে বললেন, “জুমন বুদ্ধিমান, খাটুয়া পোলা। নিজের সংসার নিজেই গইড়া লইতে চায়, ভালা ভালা। হে পারবো, দেহিছ মা, হে পারবো। আমি দুআ দিলাম।”
জুমনের ধারণা প্রধানবাড়ির সংসারে তাকে কেউ মূল্যায়ন করেনা। নিজেকে বঞ্চিত ভেবে গফুর প্রধানকে তার ক্ষোভের কথা জানায়। বললো,”তুই ভাইব্বা দেক ছোড়দা, এই বাড়িতে থাকলে আমি যে এতিম, হেই এতিমই থাকমু। বড়দারে কইয়া দিছ, আমারে যেন আলাদা কইরা দেয়।” পাশে মার্বেল খেলছিলো কাদের আর সোবহান। গফুর প্রধানের ৩ বছরের ছেলে ইসমাইল বাপের মতো লম্বা হবে,দেখতে লিকলিকে শুকনো। কোমরে হাত রেখে নিমগ্ন হয়ে তাদের খেলা দেখছে। জুৃমনের কথাটা কাদের প্রধানের কানে যায়। চাচার পাশে গিয়ে দাঁড়ায় সে। বলে,”কি কইলি জুমন চাচা? তুই ভিন্ন হইয়া যাইতে চাছ? কি জইন্য?কোনহানে যাইবিনা তুই। এই বাড়িতেই থাকবি। হাসেমরে ত আমি যাইতেই দিবনা। সে আমার ভাই না?” সুযোগ বুঝে ইসমাইল বাবার কোলে গিয়ে ওঠে।
কিন্তু অভিমানী জুমনকে ফিরানো গেলোনা। নিজের বাড়ি থেকে চোখের জলে ভিজে বউ-বাচ্চাকে নিয়ে বেরিয়ে গেলো একদিন। তাদের নিয়ে ক’দিন শশুরবাড়িতে, আবার ক’দিন কাদিগড়ে মায়ের কাছে গিয়ে কাটালো। পূর্ব গাজীপুর তার শশুরবাড়ির কাছে, দক্ষিণ দিকে একসঙ্গে ৯ বিঘা মানে ৩ একর জমিসহ ভিটাবাড়ি পাওয়া গেলো। আব্বাস শেখের জমি। এই জমি তিনি বিক্রি করে দেবেন। দেরী না করে জুমনকে এই জমিটা কিনে দিলেন তার সৎ পিতা পানাউল্লা সরকার ও তার সহোদরা লালজানের স্বামী মাগন আলী সরকার, জুমনের চেয়ে বয়সে কয়েক বছরের বড়ো। নগরীবিবির দ্বিতীয় সন্তান লালজান। ছোটবোনের স্বামী হলেও বয়স বিবেচনায় মাগন আলী জুমনকে বিশেষ স্নেহ করতেন। তিনি পাড়াগাঁওয়ের একজন ধনবান ব্যক্তি,প্রচুর জমিজমা ও অর্থবিত্তের মালিক, সেইসাথে স্থানীয় বাজারে বড় দোকান আছে তার। বিশিষ্ট ব্যবসায়ীও তিনি। মুসলিম লীগের স্থানীয় যুব নেতা তিনি, পাকিস্তান আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী।
পানাউল্লার দুই মেয়ে ও এক ছেলে। লালজান বড়ো, তারপর নেয়ামতআলী সরকার,সবার ছোট নয়নজান। নয়নজানকে বাড়ির লোকেরা তারি বলে ডাকে। জুমন তাদের সহোদর বড়ভাই। তার বাবা অন্য কেউ এটা জুমন কাদিগড় ছেড়ে আসার আগে কেউ জানতে পারেনি।
এদিকে সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্র পাকিস্তানেও দ্রুত কিছু মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে গেলো।
প্রতিষ্ঠার পর পরই পাকিস্তানের ভাগ্যাকাশে মেঘের আনাগোনা শুরু হলো। শাসকগোষ্ঠী ও নেতাদের মধ্যে
শুরু হলো ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। সেনাবাহিনীও তাতে জড়িয়ে পড়ে। পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গেও নানা বিষয়ে মতান্তর শুরু হয়েছে। তাদের অভিযোগ, রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহনে পূর্ববঙ্গের মতামতকে উপেক্ষা করা হচ্ছে। এসব নিয়ে সঙ্গত কারণেই পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন দেখা দিলো। ইতোমধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তানের বিমাতা সুলভ আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন পূর্ববঙ্গের নেতারা। এদিকে অসন্তোষের আগুনে ঘি ঢেলে দিলেন পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর-জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। তার রাষ্ট্রভাষা ঘোষণায় পূর্ব পাকিস্তানে বড় ধরনের আন্দোলনের সুযোগ করে দিলো। ঘটনা ঘটছিলো দ্রুত। দেশব্যাপী অনৈক্য, অসন্তোষ আর নেতৃত্বের দ্বন্দ্বের মধ্যে ১৯৪৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর, করাচিতে জিন্নাহ মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিলো ৭১ বছর। দীর্ঘকাল যক্ষ্মা ও ফুসফুসের ক্যানসারে ভুগছিলেন তিনি। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে কোয়েটা থেকে দ্রুত করাচিতে ফিরিয়ে নেয়ার পথে দুর্ভাগ্যজনকভাবে তার অ্যাম্বুলেন্স বিকল হয়ে গেলো। এই অবস্থায় তার ত্বরিত চিকিৎসার কোন ব্যবস্থা হলোনা। পাকিস্তানের প্রথম গভর্ণর, দেশের সর্বোচ্চ শাসক, দেশের মানুষ যাকে ভালবেসে কায়েদে আযম উপাধি দিয়েছিলেন, এমনি অসহায় অব্যবস্থায় তাঁর মৃত্যু হলো। তারপরও পাকিস্তানের দুঃখ রজনী প্রভাত হলোনা অধিকন্তু আরও অন্ধকারের ঢাকা পড়লো।
১৯৫১ সালের ১৬ অক্টোবর পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান রাওয়ালপিন্ডির কোম্পানি বাগে (বর্তমান লিয়াকত বাগ) এক জনসভায় ভাষণ দেওয়ার সময় আততায়ীর গুলিতে নিহত হন। সাইদ আকবর বাবরাকজাই নামে একজন আফগান নাগরিক তাঁকে নিকট থেকে গুলি করে। সঙ্গে সঙ্গে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এবং ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। কেন এই হত্যাকান্ড? কী উদ্দেশ্য ছিলো হত্যাকরীর? হন্তক আকবর বাবরাকজাইও রক্ষা পায়নি। একইসাথে নিরাপত্তা রক্ষীরা তাকে গুলি চালিয়ে হত্যা করে। হয়তো সে কারণেই আজোঅব্দি লিয়াকত আলী খানের হত্যা রহস্যের কারণ জানা যায়নি।
এসব ঘটনাক্রম পাকিস্তানের পূর্ব ও পশ্চিম অংশে অস্থিরতা বৃদ্ধি পেতে থাকে।
এক রাষ্ট্র হলেও পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে প্রায় দুই হাজার কিলোমিটারের (প্রায় ১২৪৩ মাইল) অধিক দূরত্বের ব্যবধান। দুটি অংশের মধ্যে আক্ষরিক অর্থেই সাংস্কৃতিক, ভৌগোলিক ও ভাষাগত দিক থেকে অনেকগুলো মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর বক্তব্যের সূত্র ধরে ১৯৪৮ সালে কেন্দ্রীয় সরকার ঘোষণা করে যে, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। এই ঘটনার প্রেক্ষাপটে পূর্ব পাকিস্তানে বসবাসকারী বাংলাভাষী সাধারণ জনগণের মধ্যে গভীর ক্ষোভের সঞ্চার হয়। এই ঘোষণা বাঙ্গালীর হৃদয়ে এক আঘাত হিসেবে বিবেচিত হয় এবং এতে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। কার্যত পূর্ববঙ্গের বাংলাভাষী মানুষ আকস্মিক ও অন্যায্য এ সিদ্ধান্তকে মেনে নিতে পারেনি। এর জন্য মানসিকভাবে তারা মোটেও প্রস্তুত ছিল না। ফলস্বরূপ মাতৃভাষা বাংলার সম-মর্যাদার দাবিতে পূর্ব বাংলায় আন্দোলন দ্রুত দানা বেঁধে ওঠে। আন্দোলন দমনে পুলিশ ১৪৪ ধারা জারি করে। ঢাকা শহরে মিছিল, সমাবেশ ইত্যাদি বেআইনি ও নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।
১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারিতে এই আদেশ অমান্য করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু সংখ্যক ছাত্র ও প্রগতিশীল কিছু রাজনৈতিক কর্মী মিলে বিক্ষোভ মিছিল শুরু করেন। মিছিলটি ঢাকা মেডিকেল কলেজের কাছাকাছি এলে পুলিশ ১৪৪ ধারা অবমাননার অভিযোগে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলিবর্ষণ করে।
গুলি খেয়ে ঘোরতর আহত হলে বরকত, রফিক, জব্বার, সালাম ও শফিক কে হাসপাতালে নেয়া হলে তাদের আগে পড়ে মৃত্যু হয়। এতে
অনেকেই আহত হন। শোকাবহ এ ঘটনার অভিঘাতে সমগ্র প্রদেশে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ২১শে ফেব্রুয়ারির ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে সারাদেশে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে ওঠে। ২২শে ও ২৩শে ফেব্রুয়ারি ছাত্র, শ্রমিক, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক ও সাধারণ জনতা পূর্ণ হরতাল পালন করে এবং সভা-শোভাযাত্রাসহ ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে। ২২শে ফেব্রুয়ারিতেও পুলিশের গুলিতে মানুষ মারা যায়।
দেশের এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের দুই অংশেই সাধারণ মানুষের মধ্যে যে অবিশ্বাস ও অস্থিরতা দেখা দিলো তার
প্রভাব ছিলো সুদূরপ্রসারী।
ছোট ভাইয়ের আকস্মিক পৃথক হওয়ার ঘটনায় মনঃক্ষুণ্ণ অলি প্রধান জুমনকে পৃথক করে দেয়ার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার জন্য তাকে প্রধানবাড়িতে ডেকে পাঠান। কিন্তু একগুঁয়ে জুমন ওই বাড়িতে ফিরে না যাওয়ার অভিপ্রায় জানিয়ে দিলো। নতুন আশা আর অসীম মনোবল নিয়ে সদ্য কেনা নতুন ভিটায় মাটি ভরাট করে নতুন ঘর তৈরি হলো। তারমধ্যে একটি শোবার ঘর যাতে টিনের বেড়া ও টিনের চাল , আরেকটি রান্নাবান্নার জন্য ছোট্ট কুঁড়েঘর। যেটি বাঁশকাঠের বেড়া দিয়ে ঘেরা আর অস্থায়ী বাঁশ কাবাড়ির কাঠামোর উপর চাল খড় শনে ছাওয়া। কোনরকমে মাথা গোঁজার ঠাঁই পেয়েই খুশি জুমন। এরপর শুরু হলো তার কঠোর পরিশ্রম। তার সাথে প্রতিটি কাজে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন পানাউল্লাহ সরকার ও তার সন্তানেরা। নগরীবিবি নিজে এসে জুমনের ঘর সাজিয়ে দিলেন। সাথে ছিলো লালজান, মাগন আলী সরকারকে স্ত্রী। মাগনকে সঙ্গে নিয়ে পরিকল্পনা মতো সংসার পুনর্গঠন করলো জুমন। প্রতিটি কাজে তার সাফল্য, নিজের চাষকৃত জমিতে আশাতীত ফসলের ফলন, ছোট প্রধান পরিবারের জীবনমানকে দ্রুত উন্নতির সোপানে পৌঁছে দিলো। শশুরবাড়ি কিংবা আপন ভাইদের সাহায্য ছাড়া তার এই উন্নতি সবার কাছে ভালো লাগেনি। জনাবালী মাদবর রোগশয্যায়। তার ছেলেরা নেতৃত্বের আধিপত্য বিস্তারে ব্যর্থ হয়ে প্রধানবাড়ির সঙ্গে পূর্ব থেকেই দূরত্ব বজায় রেখে চলতো। এদিকে বোনের জামাই হলেও জুমনের শনৈ শনৈ উন্নতিতে কারো কারোর চক্ষুপীড়ন শুরু হলো।

Leave a Reply

Your email address will not be published.