আশিকুর রহমান সবুজ, গাজীপুর জেলা প্রতিনিধি:
গাজীপুরের শ্রীপুরে এক ব্যবসায়ীকে তার নিজ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে প্রকাশ্য দিবালোকে তুলে নিয়ে একটি ‘টর্চার সেলে’ আটকে রেখে বর্বরোচিত নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। অপহরণের পর ওই ব্যবসায়ীর ওপর শারীরিক নির্যাতন চালিয়ে তার দোকান থেকে নগদ লক্ষাধিক টাকা ও মালামাল লুটপাট করা হয়েছে। গত ১০ এপ্রিল বুধবার সন্ধ্যায় শ্রীপুর পৌরসভার কেওয়া বাজারে এই লোমহর্ষক ঘটনাটি ঘটে। এই ঘটনায় ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী মোঃ পারভেজ বাদী হয়ে শ্রীপুর মডেল থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন, যা এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার মুলাইদ গ্রামের আবুল হোসেনের ছেলে মোঃ পারভেজ কেওয়া বাজারে দীর্ঘ ৮ বছর ধরে অত্যন্ত সুনামের সাথে ‘বিসমিল্লাহ টেলিকম’ ও ‘বিসমিল্লাহ এক্সেসরিজ’ নামক দুটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে আসছেন। গত ১০ এপ্রিল সন্ধ্যা আনুমানিক সাড়ে ৬টার দিকে যখন বাজারে ইফতার পরবর্তী স্বাভাবিক ব্যস্ততা ছিল, ঠিক তখনই অভিযুক্তরা দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে তার দোকানে অতর্কিত হামলা চালায়। হামলাকারীরা দোকানে ঢুকেই তান্ডব শুরু করে এবং ক্যাশবক্স থেকে নগদ ৭ লাখ ৮০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেয়। এছাড়াও তারা দোকানের বিক্রয়কাজে ব্যবহৃত বিকাশের দুটি মূল্যবান মোবাইল ফোন এবং দোকানের সামনে রাখা একটি হিরো স্প্লেন্ডার মোটরসাইকেল (ঢাকা মেট্রো হ-৬৩-৮৩০৭) জোরপূর্বক নিয়ে যায়।
লুটপাটের তাণ্ডব চালানোর পর হামলাকারীরা ব্যবসায়ী পারভেজকে জোরপূর্বক অপহরণ করে দোকান থেকে বের করে নিয়ে যায়। তাকে কেওয়া বাজার সংলগ্ন একটি বহুতল ভবনের পঞ্চম তলায় নিয়ে যাওয়া হয়। ভুক্তভোগীর দাবি অনুযায়ী, ওই ভবনের একটি নির্জন কক্ষকে হামলাকারীরা ‘টর্চার সেল’ হিসেবে ব্যবহার করে আসছিল। সেখানে তাকে আটকে রেখে হাত-পা বেঁধে দেশীয় অস্ত্র ও লোহার রড দিয়ে এলোপাথাড়ি মারধর করা হয়। নির্যাতনের একপর্যায়ে তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর জখম হয় এবং রক্তক্ষরণ শুরু হয়। বর্বরতার সীমা ছাড়িয়ে হামলাকারীরা ওই মুমূর্ষু অবস্থায় পারভেজের পরিবারের কাছে আরও ৩ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে এবং টাকা না দিলে তাকে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দেয়।
আজ ১৫ এপ্রিল সোমবার সরেজমিনে সাংবাদিকরা ওই ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে গেলে সেখানে ধ্বংসযজ্ঞের চিহ্ন দেখতে পান। দোকানের আসবাবপত্র ভাঙা এবং মালামাল চারদিকে এলোমেলো অবস্থায় পড়ে ছিল। অপরাধের আলামত নষ্ট করার উদ্দেশ্যে হামলাকারীরা দোকানের সিসি ক্যামেরাগুলো ভেঙে ফেলেছে এবং সিসিটিভির ডিভিআর (হার্ডডিস্ক) খুলে নিয়ে গেছে।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, ঘটনার দিন অভিযুক্তরা অত্যন্ত বেপরোয়াভাবে দোকানে ঢুকে লুটপাট চালায়। তারা আরও জানান, বাজারের মতো জনাকীর্ণ জায়গায় সবার সামনেই একজন ব্যবসায়ীকে তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় তারা চরম আতঙ্কিত। স্থানীয় এক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “এমন ফিল্মি কায়দায় অপহরণ আগে কখনো দেখিনি। আমরা এখন নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত।”
ভুক্তভোগী পারভেজ জানান, এই নৃশংস হামলার মূল পরিকল্পনাকারী ও হামলাকারীরা আসলে তার বিবাহিত স্ত্রী ও শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়স্বজন। মূলত দীর্ঘদিনের পারিবারিক কলহ ও ব্যক্তিগত বিরোধের জের ধরে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে এই হামলা, অপহরণ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটানো হয়েছে। ঘটনার পর স্থানীয়দের সহায়তায় তাকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে প্রাথমিক ও উন্নত চিকিৎসা প্রদান করা হয়।
এই বিষয়ে শ্রীপুর মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ নাছির আহমদ গণমাধ্যমকে জানান, “আমরা লিখিত অভিযোগটি হাতে পেয়েছি। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্ত করা হচ্ছে। একজন ব্যবসায়ীকে দোকান থেকে তুলে নিয়ে মারধর ও লুটপাটের বিষয়টি আইনগতভাবে কঠোরভাবে দেখা হবে। তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের শনাক্ত করে দ্রুত গ্রেফতার ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
বর্তমানে ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী পারভেজ ও তার পরিবার চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছেন। তারা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন এবং লুণ্ঠিত মালামাল উদ্ধারসহ এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার সাথে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জোর দাবি জানিয়েছেন। বাজারের সাধারণ ব্যবসায়ীরাও এই ঘটনায় দোষীদের দ্রুত বিচার দাবি করে এলাকায় নিরাপত্তা জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন।

Leave a Reply