কয়রায় ঘূর্ণিঝড় দুর্যোগ প্রস্তুতি বিষয়ক মহড়া

কয়রায় ঘূর্ণিঝড় দুর্যোগ প্রস্তুতি বিষয়ক মহড়া

কয়রা (খুলনা) প্রতিনিধি:

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় জনপদ খুলনার কয়রা উপজেলা। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে প্রতি বছরই ছোট-বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগের মোকাবিলা করতে হয় এই অঞ্চলের মানুষকে। আসন্ন ঘূর্ণিঝড় মৌসুমকে সামনে রেখে জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও জানমালের ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনার লক্ষ্যে খুলনার কয়রায় এক বিশেষ ঘূর্ণিঝড় দুর্যোগ প্রস্তুতি বিষয়ক মহড়া অনুষ্ঠিত হয়েছে।

​বুধবার (১৫ এপ্রিল) বিকাল ৪টায় উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়ন পরিষদ মাঠে এই মহড়া অনুষ্ঠিত হয়। জাপানের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ‘শাপলা নীড়’ ও ‘জাগ্রত যুব সংঘ (জেজেএস)’ এর বাস্তবায়নাধীন ‘প্রস্তুতি’ প্রকল্পের কারিগরি সহযোগিতায় এবং দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়ন পরিষদের সার্বিক আয়োজনে এই মহড়া সম্পন্ন হয়।

​মহড়া শুরুর আগে দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসে স্থানীয়দের করণীয় নিয়ে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। জেজেএস প্রস্তুতি প্রকল্পের প্রকল্প কর্মকর্তা শ্রী অশোক রায়ের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ওসমান গনি খোকন। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান মনজুর আলম নান্নু, স্থানীয় বিএনপি নেতা গাজী সিরাজুল ইসলাম এবং প্রস্তুতি প্রকল্পের প্রকল্প সমন্বয়কারী মোঃ আব্দুল মালেক।

​বক্তারা বলেন, “কয়রা উপজেলার মানুষ প্রতিনিয়ত প্রকৃতির সাথে লড়াই করে বেঁচে থাকে। সিডর, আইলা, আম্পান বা রিমালের মতো দুর্যোগ আমাদের শিখিয়ে দিয়ে গেছে যে, কেবল সঠিক প্রস্তুতিই পারে প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষতি কমাতে। জাপানি উন্নয়ন সংস্থা শাপলা নীড় ও জেজেএস-এর এই উদ্যোগ উপকূলীয় মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখবে।

​পারিবারিক পর্যায়ে ঘূর্ণিঝড় দুর্যোগ প্রস্তুতি বিষয়ক এই মহড়ায় একটি ‘আদর্শ গ্রাম’ তৈরি করে দেখানো হয়। যেখানে একটি গ্রামের সাধারণ মানুষ দুর্যোগের পূর্বে, দুর্যোগ চলাকালীন এবং দুর্যোগ পরবর্তী সময়ে কীভাবে জীবন ও সম্পদ রক্ষা করবে—তার একটি প্রাণবন্ত চিত্র তুলে ধরা হয়।

​মহড়ায় ওই গ্রামের সাতটি পরিবারের সদস্যরা নিপুণ অভিনয়শৈলীর মাধ্যমে দুর্যোগ প্রস্তুতির বিভিন্ন ধাপ প্রদর্শন করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল:

ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি (সিপিপি)-এর স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে সংকেত প্রদান এবং ইউনিয়ন পরিষদ বা নির্দিষ্ট স্থানে সতর্ক পতাকা উত্তোলনের নিয়ম দেখানো হয়।ঘূর্ণিঝড়ের তীব্র বাতাস থেকে ঘর রক্ষা করতে দড়ি দিয়ে ঘরের চার কোণ ‘টানা’ দেওয়ার কৌশল প্রদর্শন করা হয়। জরুরি শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানি মাটির নিচে পলিথিনে মুড়িয়ে পুঁতে রাখা এবং পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ দলিল-দস্তাবেজ (জমির কাগজ, আইডি কার্ড) নিরাপদ ব্যাগে সংরক্ষণের দৃশ্য ছিল শিক্ষণীয়।গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি নিরাপদ উঁচুতে রাখা এবং পরিবারের বৃদ্ধ, শিশু ও গর্ভবতী নারীদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দ্রুত নিকটস্থ সাইক্লোন শেল্টারে নেওয়ার দৃশ্যটি ছিল অত্যন্ত বাস্তবসম্মত।আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার পর সেখানে নারী, মেয়ে ও প্রবীণদের জন্য আলাদা কক্ষের ব্যবস্থা ও নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে তুলে ধরা হয়।

​উপকূলীয় এই জনপদে দুর্যোগের বার্তা পৌঁছে দিতে আয়োজিত এই মহড়াটি উপভোগ করতে দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম থেকে পাঁচ শতাধিক নারী, পুরুষ ও শিশু উপস্থিত হন। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, হাতে-কলমে এই মহড়া দেখার ফলে তারা দুর্যোগের সময় ঘাবড়ে না গিয়ে কীভাবে ঠান্ডা মাথায় কাজ করতে হবে, সে সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পেয়েছেন।

​আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, উপকূলীয় এলাকায় দুর্যোগের ঝুঁকি কেবল সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়; বরং পারিবারিক পর্যায় থেকে প্রস্তুতি নেওয়া হলে ক্ষয়ক্ষতি সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখা সম্ভব। জাপানি প্রযুক্তি ও স্থানীয় অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে ‘প্রস্তুতি’ প্রকল্প কয়রাবাসীর জীবনমান ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কাজ করে যাচ্ছে।

​বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার আগে মহড়াটি শেষ হয়। উপস্থিত সাধারণ মানুষ এই ধরনের সচেতনতামূলক আয়োজনের জন্য আয়োজক সংস্থাকে ধন্যবাদ জানান এবং ভবিষ্যতে প্রতিটি ওয়ার্ডে এমন মহড়া আয়োজনের দাবি জানান। সব মিলিয়ে এক আনন্দঘন ও শিক্ষণীয় পরিবেশের মধ্য দিয়ে শেষ হয় ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতির এই বিশেষ প্রদর্শনী।

Leave a Reply

Your email address will not be published.