কয়রায় গ্রাম আদালত ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা

কয়রায় গ্রাম আদালত ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা

কয়রা (খুলনা) প্রতিনিধিঃ

খুলনার কয়রা উপজেলায় তৃণমূল পর্যায়ে বিচারিক সেবা সহজলভ্য করা এবং গ্রাম আদালতের কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করার লক্ষ্যে উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সরকার বিভাগের উদ্যোগে গ্রাম আদালত ব্যবস্থাপনা কমিটির এক গুরুত্বপূর্ণ ত্রৈমাসিক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বুধবার (১৫ এপ্রিল) বেলা ১১টায় উপজেলা পরিষদ সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এই সভায় গ্রাম আদালতের বর্তমান অগ্রগতি, কেস ব্যবস্থাপনা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের দায়িত্ব পালনে পেশাদারিত্ব বৃদ্ধির বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।

​সরকারের স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণ প্রকল্পের আওতায় গ্রাম আদালত একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে কাজ করছে। বিশেষ করে গ্রামীণ জনপদে ছোটখাটো বিবাদ নিরসন এবং স্বল্প সময়ে ও নামমাত্র খরচে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে গ্রাম আদালতের ভূমিকা অনস্বীকার্য। কয়রা উপজেলায় এই আদালতের কার্যক্রমের ত্রৈমাসিক মূল্যায়ন করার লক্ষ্যেই এ সভার আয়োজন। সভায় হিসাব সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর এবং ইউনিয়ন পরিষদ প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের দক্ষতা ও তাদের দৈনন্দিন কার্যক্রমে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জসমূহ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়।

​কয়রা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মোঃ আব্দুল্লাহ আল বাকী-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিল ইউনিয়ন পর্যায়ে গ্রাম আদালতের মামলার বর্তমান চিত্র। সভায় উপস্থিত ছিলেন কয়রা উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও গ্রাম আদালত সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ।

​অনুষ্ঠানে বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে বক্তব্য রাখেন ইউনিয়ন প্রশাসনিক কর্মকর্তা ইকবাল হোসেন, আল আমিন হোসেন, বাশিরুল ইসলাম এবং গ্রাম আদালতের উপজেলা সমন্বয়কারী মরিয়ম খাতুন। এছাড়াও সভায় উপজেলার ৭টি ইউনিয়নের প্রশাসনিক কর্মকর্তা, গ্রাম আদালত সহকারী, সাংবাদিকবৃন্দ এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন।

​সভায় প্রতিটি ইউনিয়নের গ্রাম আদালতের কেস ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি নিয়ে পাওয়ারপয়েন্ট প্রেজেন্টেশন ও মৌখিক পর্যালোচনা করা হয়। বিশেষ করে মামলার ডায়েরি রক্ষণাবেক্ষণ, নোটিশ জারি এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মামলার নিষ্পত্তির হার নিয়ে তথ্য উপস্থাপন করা হয়। সভায় দেখা যায় যে, কিছু ইউনিয়নে মামলার নিষ্পত্তির হার আশাব্যঞ্জক হলেও কিছু ক্ষেত্রে জটিল মামলার কারণে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হচ্ছে।

​আলোচনায় উঠে আসে যে, গ্রাম আদালতের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ জমিজমা সংক্রান্ত ছোট বিরোধ এবং পারিবারিক কলহ সহজেই মেটাতে পারছে। তবে ইউনিয়ন পর্যায়ে দক্ষ জনবলের অভাব এবং ডিজিটাল পদ্ধতিতে কেস এন্ট্রি করার ক্ষেত্রে কিছু যান্ত্রিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। সভায় উপস্থিত প্রশাসনিক কর্মকর্তারা তাদের মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন এবং বিচারিক প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ করার আহ্বান জানান।

​সভায় ভবিষ্যতে গ্রাম আদালতের দক্ষতা বৃদ্ধি ও সেবা প্রদানের পরিধি বাড়াতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ গৃহীত হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:-গ্রাম আদালতের প্রতিটি মামলার তথ্য নিয়মিতভাবে অনলাইন পোর্টালে হালনাগাদ করা।হিসাব সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটরদের বিচারিক নথি সংরক্ষণে আরও উন্নত প্রশিক্ষণ প্রদান।ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের সাথে সমন্বয় করে সালিশি প্রক্রিয়ায় নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা।

​সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ আব্দুল্লাহ আল বাকী তার সমাপনী বক্তব্যে বলেন, “তৃণমূলের সাধারণ মানুষের কাছে ন্যায়বিচার পৌঁছে দেওয়ার প্রধান মাধ্যম হলো গ্রাম আদালত। এই আদালতকে কার্যকর ও জনবান্ধব করতে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের আরও বেশি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। সাধারণ মানুষ যেন হয়রানির শিকার না হয় এবং তাদের মধ্যে গ্রাম আদালতের সেবা সম্পর্কে আস্থা তৈরি হয়, সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।”

​তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, অনেক মানুষ এখনো গ্রাম আদালতের সুফল সম্পর্কে অবগত নয়। তাই জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে হাট-বাজারে মাইকিং, লিফলেট বিতরণ ও উঠান বৈঠকের মাধ্যমে ব্যাপক প্রচার কার্যক্রম জোরদার করার নির্দেশনা প্রদান করেন।

​গ্রাম আদালতের কার্যক্রমের গতিশীলতা বজায় রাখতে সংশ্লিষ্টদের মাসভিত্তিক প্রতিবেদন জমা দেওয়ার এবং তদারকি বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। এই সভার মাধ্যমে কয়রা উপজেলার বিচারিক ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং সামাজিক শান্তি বজায় রাখার ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.