উচ্চশিক্ষার বর্তমান: দিশাহীনতা না নতুন সম্ভাবনা?প্রফেসর ড. মো: আবু তালেব

উচ্চশিক্ষার বর্তমান: দিশাহীনতা না নতুন সম্ভাবনা?প্রফেসর ড. মো: আবু তালেব


নজমুল হক, গাজীপুর
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা খাত আজ এক দ্বৈত বাস্তবতার মুখোমুখি—একদিকে বিস্ময়কর সম্প্রসারণ, অন্যদিকে গভীর মানসংকট। স্বাধীনতার পর যেখানে বিশ্ববিদ্যালয় ছিল হাতে গোনা ৬টি, আজ সেই সংখ্যা ১৭৫–এ দাঁড়িয়েছে। এই দ্রুত সম্প্রসারণ উচ্চশিক্ষাকে গণমুখী করেছে বটে, কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে—এই বিস্তার কি সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা নিয়ে এগোচ্ছে, নাকি দিশাহীনতার দিকে?

পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশে বর্তমানে ৫৭টি পাবলিক, ১১৬টি প্রাইভেট ও ২টি আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, পাশাপাশি দুই হাজারের বেশি কলেজ উচ্চশিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। শিক্ষার্থী সংখ্যাও ব্যাপকভাবে বেড়েছে—১৯৭২ সালে যেখানে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষার্থী ছিল মাত্র ৩১ হাজার, এখন তা ৩০ লাখের বেশি। এই অগ্রগতি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু বিস্তারের এই সাফল্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে গুণগত দুর্বলতা, যা উচ্চশিক্ষাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। বিশ্বব্যাপী তুলনায় বাংলাদেশ এখনও পিছিয়ে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশে তৃতীয় স্তরের শিক্ষায় ভর্তির হার প্রায় ২৩–২৪ শতাংশ, যেখানে বৈশ্বিক গড় ৪০ শতাংশেরও বেশি। অর্থাৎ সুযোগ বাড়লেও তা এখনও সীমিত, এবং যারা সুযোগ পাচ্ছে তাদের শিক্ষার মানও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে প্রতিযোগিতামূলক নয়।

গুণগত সংকটের মূল কারণগুলো বহুমাত্রিক। প্রথমত, বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ অবকাঠামো ও দক্ষ শিক্ষকসংখ্যা বাড়েনি। উদাহরণস্বরূপ, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গড়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা অনেক বেশি, যা শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাতকে চাপে ফেলছে। ফলে ব্যক্তিকেন্দ্রিক শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, অনেক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার চেয়ে বাণিজ্যিক মুনাফাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে—যা উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে। তৃতীয়ত, পাঠ্যক্রম ও গবেষণায় আধুনিকতার অভাব বড় সমস্যা। অনেক শিক্ষার্থী অভিযোগ করছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো পুরনো ও অপ্রাসঙ্গিক বিষয় পড়ানো হয়, যা বাস্তব জীবনের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে স্নাতক শেষ করেও অনেকেই কর্মক্ষেত্রে অযোগ্য হয়ে পড়ছে। এরই প্রতিফলন দেখা যায় শিক্ষিত বেকারত্ব বৃদ্ধিতে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিদেশমুখী প্রবণতা। উন্নত মানের শিক্ষার খোঁজে প্রতিবছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী বিদেশে যাচ্ছে—শুধু ২০২২ সালেই প্রায় ৪৯ হাজার শিক্ষার্থী বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমিয়েছে। এটি একদিকে বৈদেশিক মুদ্রার চাপ সৃষ্টি করছে, অন্যদিকে দেশের উচ্চশিক্ষার প্রতি আস্থার সংকটকে স্পষ্ট করছে।

তবে পুরো চিত্রটি হতাশার নয়। কিছু বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়ে অবস্থান তৈরি করছে এবং গবেষণায় অগ্রগতি দেখাচ্ছে। যেমন, কিছু প্রতিষ্ঠানের গবেষণার মান ও আঞ্চলিক র‍্যাংকিংয়ে উন্নতি বাংলাদেশের সম্ভাবনাকে নির্দেশ করে। এছাড়া ডিজিটাল শিক্ষা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও দক্ষতাভিত্তিক কারিকুলাম চালুর উদ্যোগও নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে। এই বাস্তবতায় প্রশ্নটি স্পষ্ট—আমরা কি দিশাহীনতার দিকে এগোচ্ছি, নাকি সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে? উত্তর নির্ভর করছে নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়নের ওপর। বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে কঠোর মানদণ্ড, শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা, গবেষণায় পর্যাপ্ত বিনিয়োগ এবং শিল্পখাতের সঙ্গে শিক্ষার সংযোগ জোরদার করা এখন সময়ের দাবি।

একই সঙ্গে উচ্চশিক্ষাকে শুধু ডিগ্রি অর্জনের মাধ্যম হিসেবে না দেখে দক্ষতা ও উদ্ভাবনের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনভিত্তিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব না দিলে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়বে। সবশেষে বলা যায়, উচ্চশিক্ষার এই ক্রান্তিকাল একদিকে সতর্কবার্তা, অন্যদিকে সম্ভাবনার আহ্বান। সঠিক পরিকল্পনা ও কার্যকর সংস্কার গ্রহণ করা গেলে এই খাতই হতে পারে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রধান চালিকাশক্তি। আর তা না হলে—এই বিস্তারই একসময় দিশাহীনতার প্রতীক হয়ে দাঁড়াবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.