কোটি টাকা ব্যয়ে পুনরাকৃতিকরণ করা বাঁধে গাছ কেটে দখল; কর্তৃপক্ষের নীরবতায় বাড়ছে ঝুঁকি

কোটি টাকা ব্যয়ে পুনরাকৃতিকরণ করা বাঁধে গাছ কেটে দখল; কর্তৃপক্ষের নীরবতায় বাড়ছে ঝুঁকি

মো: রুমি শরীফ

পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধের স্লোপ দখল করে নির্মিত ৬৭৩টি স্থাপনা উচ্ছেদে একসময় ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়া হয়েছিল ৭ কোটি ৩১ লাখ ৬৫ হাজার ৬৩৭ টাকা। উদ্দেশ্য ছিল কুয়াকাটা-গঙ্গামতি পর্যটন এলাকার সৌন্দর্য রক্ষা, বাঁধকে টেকসই করা এবং সাগরের ভাঙন থেকে উপকূলীয় জনপদ ও মানুষের জীবন-সম্পদ রক্ষা। কিন্তু সেই বাঁধেই ফের শুরু হয়েছে দখল ও স্থাপনা নির্মাণের প্রতিযোগিতা।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের ৪৮ নম্বর ফোল্ডারের আওতাধীন প্রায় ৩৯ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ পুনরাকৃতিকরণ, সৌন্দর্যবর্ধন ও ভাঙনরোধে ২০১৯ সালে উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরবর্তীতে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় প্রায় দেড়শ কোটি টাকা ব্যয়ে বাঁধের মেরামত, পুনরাকৃতিকরণ ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ করা হয়।

কুয়াকাটা সৈকতসংলগ্ন এলাকায় সাগরের ভাঙন ঠেকাতে স্থাপন করা হয় কংক্রিটের ব্লক। বাঁধের রিভার ও কান্ট্রি সাইটে করা হয় বনায়ন এবং তৈরি করা হয় ঘাসের আবরণ। একই প্রকল্পের আওতায় নয়টি স্লুইসগেটও মেরামত ও পুনর্নির্মাণ করা হয়। পর্যটন এলাকার সৌন্দর্যের পাশাপাশি লতাচাপলী, কুয়াকাটা পৌরসভা ও ধুলাসার ইউনিয়নের একাংশের মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষাই ছিল এসব উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য।

কিন্তু কয়েক বছরের ব্যবধানেই আবার দখল

সরেজমিনে বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) কুয়াকাটা সৈকতের মিরাবাড়ি থেকে ঝাউবাগান পর্যন্ত এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বেড়িবাঁধের রিভার সাইটে ছোট-বড় অসংখ্য স্থাপনা গড়ে উঠেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এরই মধ্যে দুই শতাধিক স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে বা নির্মাণাধীন রয়েছে।সেখান থেকে গঙ্গামতি সেতু এলাকার ধোলাই মার্কেট পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে নতুন করে স্থাপনা গড়ে উঠতে দেখা যায়। বিশেষ করে ধোলাই মার্কেটের দুই পাশে এখনও নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, বাঁধের স্লোপে থাকা বন বিভাগের সৃজিত গাছপালা কেটে জায়গা পরিষ্কার করে সেখানে দোকানপাটসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে। ফলে একদিকে যেমন সরকারি সম্পত্তি দখল হচ্ছে, অন্যদিকে নষ্ট হচ্ছে বাঁধের সবুজ আবরণ ও পরিবেশগত সুরক্ষা ব্যবস্থা।

উচ্ছেদে কোটি টাকা, আবারও একই চিত্র—দায় কার?

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে—যে ৬৭৩টি স্থাপনা অপসারণে সরকারকে ৭ কোটি ৩১ লাখ ৬৫ হাজার ৬৩৭ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হয়েছিল, কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে পুনরাকৃতিকরণ করা সেই বাঁধে আবার কীভাবে নতুন করে স্থাপনা নির্মাণের সুযোগ তৈরি হলো?

সচেতন মহলের প্রশ্ন, একবার উচ্ছেদ ও ক্ষতিপূরণের পরও যদি একই জায়গায় আবার দখল শুরু হয়, তাহলে আগের সরকারি ব্যয় ও উচ্ছেদ কার্যক্রমের কার্যকারিতা কোথায়? নতুন করে স্থাপনা নির্মাণের সময় সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো কী ভূমিকা পালন করেছে—এ নিয়েও উঠছে প্রশ্ন।

অভিযোগ রয়েছে, বাঁধের গাছপালা কেটে স্থাপনা নির্মাণ চললেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর নজরদারি চোখে পড়ছে না। এতে দখলদাররা আরও উৎসাহিত হচ্ছেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

বাঁধ দুর্বল হলে ঝুঁকিতে পর্যটন এলাকা

স্থানীয় সচেতন মানুষের আশঙ্কা, এভাবে বাঁধের স্লোপ দখল, মাটি কাটা ও গাছপালা ধ্বংস অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে বাঁধের স্থায়িত্ব হুমকির মুখে পড়তে পারে। একই সঙ্গে সাগরের ভাঙন, জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড়ের সময় ঝুঁকি বাড়তে পারে কুয়াকাটা ও আশপাশের জনপদের।

অন্যদিকে বাঁধের ওপর ও পাশে অপরিকল্পিত স্থাপনা গড়ে উঠলে কুয়াকাটার পর্যটন এলাকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও নষ্ট হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের ভাষায়, একদিকে সরকারি অর্থ ব্যয়ে বাঁধ রক্ষা ও সৌন্দর্যবর্ধন, অন্যদিকে সেই বাঁধের ওপরই প্রকাশ্যে দখলের নতুন প্রতিযোগিতা—এ যেন সরকারি উদ্যোগের সঙ্গে দখলদারির পাল্টা প্রতিযোগিতা।

রাজনৈতিক ছত্রছায়ার অভিযোগ

স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোগ রয়েছে, একটি রাজনৈতিক দলের কথিত চিহ্নিত একটি চক্র এসব দখলদারকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করছে। তবে এ অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি এবং যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাদের বক্তব্যও পাওয়া প্রয়োজন।

সচেতন মহল বলছে, দখলদার যে পরিচয়েরই হোক না কেন, সরকারি বাঁধ ও স্লোপ দখল এবং বন বিভাগের গাছ কাটার অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তাদের।

কর্তৃপক্ষ যা বলছে

পানি উন্নয়ন বোর্ড কলাপাড়ার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শাহআলম জানান, কুয়াকাটা সৈকতের পাশে যেসব স্থাপনা তোলা হয়েছে, সেগুলো অপসারণে মাইকিং করা হয়েছে। এছাড়া ধোলাই মার্কেট এলাকায় নির্মিত স্থাপনা অপসারণেও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

কুয়াকাটা সি-বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির সদস্য ও কুয়াকাটা পৌরসভার প্রশাসক, সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ইয়াসীন সাদেক জানান, এসব স্থাপনা অপসারণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

তবে বাঁধের স্লোপের গাছপালা কেটে কীভাবে স্থাপনা নির্মাণের সুযোগ তৈরি হলো—এ বিষয়ে গঙ্গামতি বিটের বন বিভাগের কর্মকর্তার কাছ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে সুনির্দিষ্ট কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তিনি বিষয়টি দেখছেন বলে জানান।

এখন প্রশ্ন—উচ্ছেদ হবে, নাকি দখলই চলবে?

স্থানীয়দের দাবি, শুধু মাইকিং কিংবা উচ্ছেদের ঘোষণা নয়, নতুন করে গড়ে ওঠা প্রতিটি অবৈধ স্থাপনা দ্রুত অপসারণ, বাঁধের স্লোপ দখলের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্তকরণ এবং গাছ কাটার অভিযোগ তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

একই সঙ্গে ভবিষ্যতে যাতে পুনরায় দখল না হয়, সেজন্য বাঁধের ৩৯ কিলোমিটার এলাকায় নিয়মিত নজরদারি ও সীমানা চিহ্নিতকরণের দাবি উঠেছে।

কারণ প্রশ্নটি শুধু কয়েকটি দোকান বা স্থাপনা অপসারণের নয়—প্রশ্ন হলো, জনগণের অর্থে নির্মিত কোটি কোটি টাকার প্রতিরক্ষা বাঁধ আবারও কি দখলদারদের হাতে চলে যাবে? নাকি এবার সরকারি সম্পদ রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে?

Leave a Reply

Your email address will not be published.