
প্রতি বছর ২৬ জুন বিশ্বব্যাপী পালিত হয় আন্তর্জাতিক মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী দিবস এবছর এই দিবসের প্রতিপাদ্য ‘বিশ্বের মাদক সমস্যা: বিদ্যমান সংকট, নতুন চ্যালেঞ্জ এবং উদ্ভাবনী সমাধান’ (World drug problem: persisting issues, new challenges, innovative responses) । জাতিসংঘ ঘোষিত এ দিবসের মূল উদ্দেশ্য হলোঃ মাদকের ভয়াবহতা সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, মাদকাসক্তি প্রতিরোধ এবং অবৈধ মাদক পাচারের বিরুদ্ধে বিশ্বজনমত গড়ে তোলা। ২০২৬ সালের এ দিবস আমাদের জন্য নতুন করে ভাবনার সুযোগ এনে দিয়েছে, কারণ মাদক শুধু একজন ব্যক্তিকে নয়, একটি পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎকেও বিপন্ন করে তোলে।
মাদকের অবৈধ পাচারও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। দেশের সীমান্ত এলাকাগুলো ব্যবহার করে অসাধু চক্র বিভিন্ন ধরনের মাদক দেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করলেও পাচারকারীরা নতুন নতুন কৌশল অবলম্বন করছে। তাই মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও পাচাররোধে শুধু আইন প্রয়োগ নয়, গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধি, সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং মাদকবিরোধী সামাজিক আন্দোলন আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
মাদক একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি। এটি শুধু একজন ব্যক্তির শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যকে ধ্বংস করে না, বরং পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে মাদকের বিস্তার একটি উদ্বেগজনক বাস্তবতা। তরুণ সমাজের একটি অংশ যখন মাদকাসক্তির অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে, তখন দেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতিও হুমকির মুখে পড়ছে।
সরকারি অভিযান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা এবং আইনি ব্যবস্থার পাশাপাশি মাদক প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর শক্তি হতে পারে সামাজিক আন্দোলন। কারণ মাদক শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়, এটি একটি সামাজিক, পারিবারিক, নৈতিক এবং সাংস্কৃতিক সমস্যা। তাই মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে সামাজিক আন্দোলন আজ সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি।
বর্তমান সময়ে ইয়াবা, হেরোইন, গাঁজা, ফেনসিডিল, আইসসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য সহজলভ্য হয়ে উঠেছে। প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে মাদক ব্যবসায়ীরা নতুন নতুন কৌশলে তরুণদের টার্গেট করছে। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের একটি অংশ কৌতূহল, হতাশা, বন্ধুবান্ধবের প্ররোচনা কিংবা সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে।
একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তি ধীরে ধীরে তার বিবেক, নৈতিকতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। মাদকাসক্তি থেকে জন্ম নেয় চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, খুন, ধর্ষণ, পারিবারিক সহিংসতা এবং নানা ধরনের অপরাধ। ফলে সমাজে অস্থিরতা বৃদ্ধি পায় এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে।
একটি দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার যুবসমাজ। কিন্তু যখন তরুণরা মাদকের করাল গ্রাসে আক্রান্ত হয়, তখন জাতির ভবিষ্যৎও হুমকির মুখে পড়ে। আজ অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী মাদকের কারণে শিক্ষা জীবন ধ্বংস করছে। অনেক পরিবার তাদের সন্তানকে হারাচ্ছে, কেউ কারাগারে যাচ্ছে, কেউ মানসিক ভারসাম্য হারাচ্ছে, আবার কেউ অকাল মৃত্যুর শিকার হচ্ছে। তরুণদের মধ্যে হতাশা, বেকারত্ব, পারিবারিক অশান্তি, সামাজিক বৈষম্য এবং মূল্যবোধের অবক্ষয় মাদকাসক্তির অন্যতম কারণ। তাই শুধু আইন প্রয়োগ করে নয়, তাদের জন্য ইতিবাচক সামাজিক পরিবেশ সৃষ্টি করেও মাদক প্রতিরোধ করতে হবে।
একজন সন্তানের জীবনের প্রথম শিক্ষালয় হলো পরিবার। পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হলে কিংবা সন্তানদের প্রতি পর্যাপ্ত নজরদারি না থাকলে তারা সহজেই বিপথগামী হতে পারে। অভিভাবকদের উচিত সন্তানদের বন্ধু হওয়া, তাদের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলা, মানসিক অবস্থার খোঁজ নেওয়া এবং তাদের চলাফেরা সম্পর্কে সচেতন থাকা। সন্তানদের সময় দেওয়া, ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ করা এবং সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চায় সম্পৃক্ত করা মাদক প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। মাদকমুক্ত সমাজ গঠনের আন্দোলন শুরু হওয়া উচিত পরিবার থেকেই। কারণ একটি সচেতন পরিবারই একটি সচেতন সমাজ গঠনের ভিত্তি।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শুধু পাঠদান কেন্দ্র নয়, এটি একজন শিক্ষার্থীর চরিত্র গঠনেরও স্থান। তাই স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে মাদকবিরোধী সচেতনতামূলক কার্যক্রম আরও জোরদার করা প্রয়োজন। নিয়মিত সেমিনার, কর্মশালা, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, রচনা প্রতিযোগিতা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাদকের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করা যেতে পারে। শিক্ষকরা যদি শিক্ষার্থীদের মানসিক ও সামাজিক সমস্যার প্রতি আন্তরিক মনোযোগ দেন, তবে অনেক শিক্ষার্থীকে মাদকাসক্ত হওয়ার আগেই সঠিক পথে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
মাদক প্রতিরোধে আইন প্রয়োগ গুরুত্বপূর্ণ হলেও শুধু আইন দিয়ে এই সমস্যা নির্মূল করা সম্ভব নয়। কারণ মাদক ব্যবসায়ীরা যতক্ষণ পর্যন্ত সামাজিকভাবে বর্জিত না হবে এবং মাদক গ্রহণকে সমাজ ঘৃণার চোখে না দেখবে, ততক্ষণ পর্যন্ত এই সমস্যা থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি পাওয়া কঠিন। সামাজিক আন্দোলন মানুষের চিন্তা, মনন ও আচরণে পরিবর্তন আনে। যখন একটি সমাজ সম্মিলিতভাবে কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়, তখন সেই অন্যায়ের বিস্তার অনেকাংশে কমে যায়। মাদকবিরোধী সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে সমাজের প্রতিটি মানুষকে সম্পৃক্ত করতে হবে। পাড়া-মহল্লা, গ্রাম, শহর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন, সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে একযোগে কাজ করতে হবে।
প্রতিটি ইতিবাচক সামাজিক পরিবর্তনের পেছনে যুবসমাজের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাই মাদকবিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্বেও তরুণদের এগিয়ে আসতে হবে। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, সামাজিক সংগঠন, স্কাউট, রোভার, বিএনসিসি, রেড ক্রিসেন্ট এবং বিভিন্ন যুব সংগঠনকে মাদকবিরোধী কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে সচেতনতা বৃদ্ধি, পথসভা, মানববন্ধন, প্রচারণা এবং গণসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা যেতে পারে। তরুণদের খেলাধুলা, সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করতে পারলে তারা মাদক থেকে দূরে থাকবে এবং সমাজের জন্য ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবে।
প্রত্যেক ধর্মই মাদককে নিরুৎসাহিত করে। ধর্মীয় অনুশাসন মানুষকে আত্মসংযম, নৈতিকতা এবং মানবিক মূল্যবোধ শেখায়। তাই মাদক প্রতিরোধে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। মসজিদ, মন্দির, গির্জা এবং অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত মাদকবিরোধী আলোচনা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা যেতে পারে। ধর্মীয় নেতারা যদি এ বিষয়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন, তবে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সহজ হবে।
গণমাধ্যম সমাজের দর্পণ হিসেবে পরিচিত। মাদকবিরোধী আন্দোলনে গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংবাদপত্র, টেলিভিশন, অনলাইন পোর্টাল এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে মাদকের ভয়াবহতা তুলে ধরতে হবে। মাদকাসক্তির কারণে ধ্বংস হয়ে যাওয়া পরিবার, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি এবং সমাজের বাস্তব চিত্র তুলে ধরলে মানুষ আরও সচেতন হবে। একই সঙ্গে সফল পুনর্বাসন এবং মাদকমুক্ত জীবনের অনুপ্রেরণামূলক গল্পও প্রচার করতে হবে।
মাদক প্রতিরোধে সরকারের কঠোর অবস্থান অপরিহার্য। সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বৃদ্ধি, মাদক পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং মাদক ব্যবসার অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক ধ্বংস করা জরুরি। একই সঙ্গে মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ বাড়াতে হবে। অনেক মাদকাসক্ত চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারে। তাই শাস্তির পাশাপাশি পুনর্বাসন ব্যবস্থাকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
যারা মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। সমাজের মানুষ যদি মাদক ব্যবসায়ীদের সম্মান না দেয় এবং তাদের সামাজিকভাবে প্রত্যাখ্যান করে, তবে তারা অনেকাংশে নিরুৎসাহিত হবে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, সাংবাদিক, ইমাম, সমাজসেবক এবং সচেতন নাগরিকদের সমন্বয়ে মাদকবিরোধী কমিটি গঠন করা যেতে পারে। নিয়মিত সচেতনতামূলক সভা, আলোচনা এবং প্রচারণার মাধ্যমে জনমত গড়ে তুলতে হবে। পরিবারভিত্তিক সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাদকবিরোধী শিক্ষা কার্যক্রম চালু করতে হবে। যুবসমাজকে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করতে হবে। ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে। মাদক পাচার ও ব্যবসার বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে। পুনর্বাসন কেন্দ্রের সংখ্যা ও মান বৃদ্ধি করতে হবে। সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে সর্বস্তরের মানুষকে সম্পৃক্ত করতে হবে। গণমাধ্যমে ধারাবাহিক মাদকবিরোধী প্রচারণা চালাতে হবে।
মাদক একটি জাতির জন্য নীরব ঘাতক। এটি মানুষের মেধা, মনন, নৈতিকতা এবং সম্ভাবনাকে ধ্বংস করে দেয়। একটি মাদকাসক্ত ব্যক্তি যেমন নিজের জীবনকে বিপন্ন করে, তেমনি পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই মাদক প্রতিরোধ কোনো একক ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সরকারের দায়িত্ব নয়, এটি সমগ্র জাতির সম্মিলিত দায়িত্ব।
আন্তর্জাতিক মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক, আমরা মাদকের বিরুদ্ধে সোচ্চার হব, তরুণ প্রজন্মকে সুরক্ষিত রাখব এবং একটি সুস্থ, নিরাপদ ও মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গঠনে সম্মিলিতভাবে কাজ করব। কারণ মাদকমুক্ত সমাজই পারে একটি সমৃদ্ধ, মানবিক ও উন্নত জাতি গঠনের ভিত্তি রচনা করতে। আন্তর্জাতিক মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী দিবসের তাৎপর্য তখনই বাস্তবায়িত হবে, যখন আমরা সচেতনতা, প্রতিরোধ এবং সামাজিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি মাদকমুক্ত প্রজন্ম গড়ে তুলতে সক্ষম হব।
মাদকমুক্ত সমাজ গঠনের জন্য প্রয়োজন সরকারি উদ্যোগসহ পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, জনপ্রতিনিধি এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা । যখন সমাজের প্রতিটি মানুষ মাদকের বিরুদ্ধে সোচ্চার হবে, তখনই গড়ে উঠবে একটি সুস্থ, সুন্দর, নিরাপদ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। তাই মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে সামাজিক আন্দোলন অপরিহার্য।
লেখক পরিচিতি:
লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল
(শিক্ষক, কবি, কলাম লেখক, সমাজসেবক ও সংগঠক)

Leave a Reply