ঢাকার জ্যাম: অব্যবস্থাপনার স্থায়ী রূপ: প্রফেসর ড. মো: আবু তালেব

ঢাকার জ্যাম: অব্যবস্থাপনার স্থায়ী রূপ: প্রফেসর ড. মো: আবু তালেব

নজমুল হক গাজীপুর


ঢাকা—দেশের প্রাণকেন্দ্র, অর্থনীতির চালিকাশক্তি, আর একই সঙ্গে বিশ্বের অন্যতম যানজটের শহর। প্রতিদিন ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত রাস্তায় থেমে থাকা গাড়ির সারি যেন এক নীরব সংকেত দেয়—এই শহরের চলাচল ব্যবস্থায় কোথাও গভীর অসংগতি রয়েছে। প্রশ্ন হলো, কেন এত বছর ধরে সমস্যা জেনেও এর কার্যকর সমাধান আসছে না? উত্তর খুঁজতে গেলে স্পষ্ট হয়—ঢাকার যানজট এখন কেবল অবকাঠামোর সংকট নয়, এটি মূলত অব্যবস্থাপনার স্থায়ী রূপ। পরিসংখ্যান পরিস্থিতির গভীরতা বোঝায়। বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, ঢাকায় প্রতিদিন প্রায় ৩ থেকে ৫ মিলিয়ন কর্মঘণ্টা যানজটে নষ্ট হয়। বছরে এর আর্থিক ক্ষতি দাঁড়ায় প্রায় ৩৫০ থেকে ৪০০ বিলিয়ন টাকার মধ্যে। বিশ্বব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, রাজধানীতে যানবাহনের গড় গতি ঘণ্টায় মাত্র ৫–৭ কিলোমিটার, যা অনেক ক্ষেত্রে হাঁটার গতির কাছাকাছি।

এ বাস্তবতা শুধু সময়ের অপচয় নয়, উৎপাদনশীলতা হ্রাস, মানসিক চাপ বৃদ্ধি এবং জ্বালানি অপচয়ের এক ভয়াবহ চক্র তৈরি করছে। এই সংকটের মূলে রয়েছে দীর্ঘদিনের পরিকল্পনাহীন নগরায়ন। ঢাকায় জনসংখ্যার ঘনত্ব বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ, কিন্তু সে অনুপাতে সড়ক অবকাঠামো বিস্তৃত হয়নি। মোট নগর এলাকার তুলনায় সড়কের পরিমাণ প্রায় ৭–৮ শতাংশ, যেখানে একটি কার্যকর নগরীর জন্য এই হার হওয়া উচিত অন্তত ২০–২৫ শতাংশ। ফলে অল্প সড়কে বিপুল যানবাহনের চাপ সৃষ্টি হয়ে স্থায়ী যানজটের জন্ম দিয়েছে। আরেকটি বড় সমস্যা হলো গণপরিবহনের দুর্বলতা ও বিশৃঙ্খলা। ঢাকার অধিকাংশ মানুষ বাসের ওপর নির্ভরশীল হলেও এই খাতটি দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ন্ত্রিত। একই রুটে অসংখ্য বাস, প্রতিযোগিতামূলক যাত্রী তোলা, নির্দিষ্ট স্টপেজ না মানা—সব মিলিয়ে এটি একটি বিশৃঙ্খল ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে। ফলে সড়কের একটি বড় অংশ অকার্যকরভাবে ব্যবহৃত হয়, যা যানজটকে আরও বাড়িয়ে তোলে। ফ্লাইওভার ও বড় বড় সড়ক প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা হয়েছে, কিন্তু এগুলো প্রায়শই মূল সমস্যাকে পাশ কাটিয়ে গেছে।

ফ্লাইওভার এক স্থান থেকে অন্য স্থানে দ্রুত যান চলাচলের সুযোগ দিলেও নিচের সড়কের বিশৃঙ্খলা অপরিবর্তিত থাকায় সামগ্রিক গতি বাড়েনি। বরং অনেক ক্ষেত্রে যানজট স্থানান্তরিত হয়েছে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায়। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। সিগন্যাল ব্যবস্থার অকার্যকারিতা, আইন প্রয়োগের সীমাবদ্ধতা এবং পথচারীদের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল শহরের ট্রাফিক প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি, যা সীমিত সড়কব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। সমাধানের পথ তাই একমুখী নয়, বরং বহুমাত্রিক। প্রথমত, গণপরিবহন ব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার জরুরি। রুট রেশনালাইজেশন, মানসম্মত বাস সার্ভিস এবং একীভূত টিকিৈৈৈটিং ঝ্যব্যবস্থা চালু করতে হবে। দ্বিতীয়ত, মেট্রোরেল ও বিআরটি প্রকল্পগুলো দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করে সেগুলোকে একটি সমন্বিত নেটওয়ার্কে রূপ দিতে হবে। তৃতীয়ত, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে—স্মার্ট সিগন্যালিং, সিসিটিভি মনিটরিং এবং ডাটা-ভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে সড়কের দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব। চতুর্থত, বিকেন্দ্রীকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সবকিছু ঢাকাকেন্দ্রিক না রেখে প্রশাসনিক, শিক্ষা ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম দেশের অন্যান্য অঞ্চলে ছড়িয়ে দিলে রাজধানীর ওপর চাপ কমবে। সবশেষে, নাগরিক সচেতনতা ও আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। কারণ যত উন্নত পরিকল্পনাই নেওয়া হোক না কেন, তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা না থাকলে সুফল আসবে না। ঢাকার যানজট আজ আর সাময়িক সমস্যা নয়; এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী সংকটে পরিণত হয়েছে। এই বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে অবকাঠামোর পাশাপাশি ব্যবস্থাপনায় আমূল পরিবর্তন আনতেই হবে। অন্যথায়, এই শহর চলবে না—শুধু থেমে থাকবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.